পপসংগীতের বিশ্ব তারকা টেইলর সুইফটের ‘লাভ স্টোরি’ শুনে নিজের গান লেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন রোদসী ইসফার ফাতেমী। এখন নিজেই গান লেখেন, সুর করেন, গানও গান। শুক্রবার দুপুরে ‘আরেকটু’ দিয়ে আলোচনায় আসা এই তরুণ শিল্পীর গল্প শুনলেন মকফুল হোসেন
‘আমায় আরেকটু কি ভালো রাখা যায়/আমায় আরেকটু কি ভালোবাসা যায়।’ ‘আরেকটু’ গানে প্রিয়জনের কাছে আরও একটু ভালোবাসা চাওয়ার আকুতি তুলে ধরেছেন রোদসী ইসফার ফাতেমী।
গানের কথায় নিজেদের অনুভূতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিভিন্ন বয়সের শ্রোতা। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানটি শেয়ার করছেন।
২৮ সেপ্টেম্বর রোদসীর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয় গানটি। আড়াই সপ্তাহে ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার বার। মন্তব্য এসেছে সাড়ে তিন শর বেশি।

মঈনুল হক নামের এক শ্রোতা লিখেছেন, ‘আমি আপনাকে কখনো চিনতাম না যদি এই গানটা সামনে না আসত। আমার চোখে এখন আপনি কোনো সাধারণ শিল্পী নয়, এককথায় অসাধারণ।’
গানটির কথা ও সুর রোদসীর নিজের। চার-পাঁচ মাস আগে গানটি লেখার কাজ শুরু করেন তিনি। পরে এক মাসের মধ্যে শেষ করেন। গানটির পেছনের গল্প বলতে গিয়ে রোদসী বলেন, ‘প্রিয়জনের কাছে আরও একটু ভালোবাসা চাওয়ার অনুভূতি থেকে গানটি লেখা। তখন আমার মনে হচ্ছিল, মানুষটিকে সরাসরি কথাগুলো বলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সরাসরি না বলে নিজের অনুভূতিগুলো গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। আমার মনে হয়েছিল, যেটুকু চাইছি, সেটুকুই তো আসলে পাওয়ার কথা। তারপরও কেন আরও একটু চাইতে হচ্ছে, সেই অনুভূতি থেকেই গানটি লেখা।’
সুরেও সেই অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছেন রোদসী। কখনো সুর চড়েছে, কখনো নেমেছে নিচে। সুরের এই ওঠানামার সঙ্গে নিজের অনুভূতিরও মিল খুঁজে পান তিনি।
টেইলর সুইফটের গান শুনে অনুপ্রেরণা
রোদসীর সংগীতজীবনে বড় প্রভাব টেইলর সুইফটের। ১৩ বছর বয়সে পত্রিকায় এই মার্কিন পপ তারকার খবর পড়েছিলেন তিনি। জেনেছিলেন, সুইফট নিজেই গান লেখেন। পরে শোনেন তাঁর ‘লাভ স্টোরি’। সেই গান শুনেই নিজের গান লেখার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন রোদসী।
রোদসী বলেন, ‘১৩ বছর বয়সে একদিন পত্রিকায় দেখেছিলাম, একজন নারী শিল্পীর অ্যালবাম সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। তিনি নিজেই গান লেখেন। এরপর টেইলর সুইফটের প্রথম গান শুনি। তখন মনে হয়েছিল, আমিও গান লিখতে চাই, নিজের অ্যালবাম বের করতে চাই। তাঁকে আবিষ্কার করার পরই নিজের গান লেখার ইচ্ছাটা তৈরি হয়। আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তিনি।’
শুরুতে ইংরেজিতে গান লিখতেন রোদসী। গিটার বাজিয়ে নিজেই সুর করতেন। কয়েক বছর পর বাংলা গান লেখার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। ১৭ বছর বয়সে লেখেন প্রথম বাংলা গান ‘এই শহরে’। পরে গানটি প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ইপি সোনালী–তে।
নিজের গান লেখা ও সুর করার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে রোদসীকে। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের সংগীতাঙ্গনে নারীদের বেশির ভাগ সময় কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই দেখা হয়। গান লেখা ও সুর করার ক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম।
রোদসী বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলের সংগীত অনেকটাই পুরুষকেন্দ্রিক। এখানে নারীদের বেশির ভাগ সময় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে দেখা হয়। অনেক নারী প্লেব্যাক করেন, কিন্তু নিজেরা গান লেখা বা সুর করার উদাহরণ তুলনামূলকভাবে কম। আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশে নিজের গান লেখা ও সুর করা নারী শিল্পীর উদাহরণ খুব বেশি দেখিনি। আন্তর্জাতিক সংগীতের প্রভাব থাকায় আমার কাছে বিষয়টি একটু আলাদা ছিল। তবে চ্যালেঞ্জ এখনো আছে।’

পপসংগীতে নিজের পরিচয় গড়তে চান
ছোটবেলা থেকেই পপসংগীতের প্রতি আগ্রহ রোদসীর। এই ধারার সুর, কথা ও মেলোডির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বের মিল খুঁজে পান তিনি। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে রকসংগীতের প্রভাব বেশি হলেও পপের জন্য আলাদা একটি পরিসর গড়ে তুলতে চান এই শিল্পী।
রোদসী বলেন, ‘পপসংগীত আমার সবচেয়ে পছন্দের। ছোটবেলা থেকেই পপ গান বেশি শুনেছি। এই সংগীতের সুর, কথা ও মেলোডির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বের মিল খুঁজে পাই। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে রকসংগীতের প্রভাব অনেক বেশি। আমি চাই, মানুষ পপসংগীতের দিকেও আরও মনোযোগী হোক। নতুন শিল্পীদের নিয়ে পপের একটি আলাদা পরিবেশ তৈরি হোক। আমার কাজের মাধ্যমে এই ধারায় কিছু অবদান রাখতে চাই।’
টেইলর সুইফটের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের পপ তারকা অলিভিয়া রদ্রিগো ও সাবরিনা কার্পেন্টারের গানও শোনেন রোদসী। আন্তর্জাতিক পপসংগীতের প্রভাব তাঁর নিজের কাজেও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। শ্রোতারা তাঁর গানের সঙ্গে অলিভিয়া রদ্রিগোর গানের মিল খুঁজে পেলে সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন।

রোদসী বলেন, ‘অলিভিয়া রদ্রিগো এখন আমার অনুপ্রেরণার একজন। তাঁর গান অনেক শুনি। টেইলর সুইফট, অলিভিয়া রদ্রিগো ও সাবরিনা কার্পেন্টারের গান অনুসরণ করি। আমার সংগীতেও পপের প্রভাব আছে। তাই শ্রোতারা আমার গানের সঙ্গে অলিভিয়ার গানের মিল খুঁজে পেলে সেটি আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। বিষয়টি ভালো লাগছে।’
নিজের গানের পাশাপাশি নতুন শিল্পীদের জন্যও পপসংগীতে কাজের পরিসর তৈরি করতে চান রোদসী। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই যে আমি আরেকটু পপের দিকে মানুষকে নিয়ে আসি বা আরও যারা নতুন নতুন আর্টিস্ট আসছে তো এখানে যেন একটা সিন তৈরি হয়।’
এরই মধ্যে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে ‘শিহরণ’ শিরোনামের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রোদসী। গানটির কথা লিখেছেন তিনি নিজেই।
নারীদের নিয়ে লাইভ ব্যান্ড
নিজের গান নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নারী বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের নিয়েও ভাবছেন রোদসী। তাঁর লাইভ ব্যান্ডের সদস্য সবাই নারী। উপযুক্ত নারী বাদ্যযন্ত্রশিল্পী খুঁজে পেতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল তাঁর।
রোদসী মনে করেন, সংগীতাঙ্গনে নারীদের শুধু কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নয়, বাদ্যযন্ত্রশিল্পী ও সংগীতের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সেই সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।
ব্যান্ডের সদস্যরা এখনো নিজেদের প্রস্তুত করছেন। তাই গানের সংগীতায়োজন ও মহড়ার বড় অংশ সামলাতে হচ্ছে রোদসীকে। ভবিষ্যতে এই দল নিয়ে নিজেদের গান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

১১ গানের অ্যালবাম
‘আরেকটু’ রোদসীর দ্বিতীয় অ্যালবামের গান। অ্যালবামের নাম এখনো ঘোষণা করেননি তিনি। আগামী ডিসেম্বরে এটি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। অ্যালবামে থাকবে প্রায় ১১টি গান। গানগুলো সাজানো হচ্ছে পপসংগীতকে প্রাধান্য দিয়ে।
সব কটি গানের কথা লিখেছেন রোদসী। চারটি গানের সংগীত প্রযোজনা, মিক্সিং ও মাস্টারিং করেছেন নিজেই। বাকি গানগুলোর কাজ করেছেন অন্য সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে।
অ্যালবাম প্রকাশ উপলক্ষে একক কনসার্ট করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সেখানে নতুন অ্যালবামের পাশাপাশি আগের অ্যালবামের জনপ্রিয় গানগুলোও পরিবেশন করবেন। আপাতত প্লেব্যাক নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই রোদসীর। তবে পছন্দের কোনো সিনেমা বা গানের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র খুঁজে পেলে কাজ করতে আপত্তি নেই তাঁর।
রোদসীর জন্ম লালমনিরহাটে, বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তাঁর বাবা সংগীতশিল্পী সাজেদ ফাতেমী, মা সুলতানা পারভীন ইয়োগা প্রশিক্ষক। রোদসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
