রুটিনে ছেদ পড়লেই দুর্ভোগে পড়তেন নগরবাসী। সিটি কাউন্সিলের কর্মীরা ধর্মঘট করলেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠত। বর্জ্য সংগ্রহ বন্ধ থাকায় পুরনো বালতি বদলে নতুনটি পাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের নিজেদের সেটি রাস্তার পাশে নিয়ে অপেক্ষা করতে হতো সংগ্রহের গাড়ির জন্য। কখনো ভারি বৃষ্টির সময় দীর্ঘ অপেক্ষার ঝামেলা এড়াতে কেউ কেউ বালতির বর্জ্য পাশের নর্দমায় ফেলে দিতেন। এতে সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি হতো বাড়তি ঝুঁকি
ভোর হওয়ার ঠিক আগের নিস্তব্ধ মুহূর্তে, যখন আধুনিক শহরের বাসিন্দারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই একসময় জেগে উঠত প্রাচীন সিঙ্গাপুরের অলিগলি। আজকের ঝকঝকে বহুতল ভবন, পরিচ্ছন্ন সড়ক আর আধুনিক নগরজীবনের আড়ালে চাপা পড়ে আছে সে শহরের এক ভিন্ন ইতিহাস—যে ইতিহাসে মিশে আছে দুর্গন্ধ, ঘাম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর এক বালতি বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের সিঙ্গাপুর আজকের পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত নগরী ছিল না। বরং সেখানে দৈনন্দিন জীবন মানেই ছিল অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, রোগবালাই আর প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই।
ত্রিশ-ষাটের দশক পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের চায়নাটাউনের সরু গলিগুলোয় প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হতো এক অদ্ভুত জীবনসংগ্রাম। অলিগলির বাড়িগুলোর পেছনে গর্ত করা শৌচাগার থেকে মরিচা ধরা টিনের বালতি বের করে আনা ছিল এক শ্রেণীর শ্রমিকের দৈনন্দিন কাজ। এ বিশেষ কাজের পরিচিতি ছিল ‘নাইট সয়েল’ সংগ্রহ হিসেবে। চায়নাটাউনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্যানিটেশনের প্রধান ভরসা ছিল নাইট সয়েল সংগ্রহকারীরা। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে একের পর এক তলায় ওঠে, মেঝের নিচে জমে থাকা মানুষের বর্জ্য নিজের লোহার বালতিতে ঢেলে নেয়ার কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিটি পূর্ণ বালতির ওজন ছিল প্রায় এক কেজি। সেই সঙ্গে ছিল অসহ্য দুর্গন্ধ।
শুধু দুর্গন্ধই নয়, কাজটি শারীরিকভাবেও কষ্টকর ছিল। কিন্তু তাদের কর্মপ্রক্রিয়া সবসময় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতো না। কখনো বালতি সরানোর সময় অসাবধানতাবশত তা বাড়ির ভেতরেই উল্টে যেত। ছড়িয়ে পড়ত দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য, দূষিত হতো ঘরের পরিবেশ। এমন পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের বিরক্তি ও ক্ষোভের মুখে পড়তে হতো দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রমিককে।
এছাড়া সে সময় সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বিশুদ্ধ পানির। বালতিগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্য সামান্য যে পানিটুকু পাওয়া যেত, তা শৌচাগার থেকে গড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসত। সংগৃহীত এসব বর্জ্য প্রথমে কাঁচা নালায়, তারপর ট্রাকে তুলে পাঠানো হতো শহরের কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে। সেখান থেকে পাম্পের মাধ্যমে কিম চুয়ান বা সেরাঙ্গুন স্লাজ ওয়ার্কসের মতো পরিশোধনাগারে তা নিষ্পত্তি করা হতো। তবে সাধারণ শ্রমিকদের সেসব সুয়ারেজ প্লান্ট নিয়ে ভাবার সুযোগ ছিল না; দিনে মাত্র ৭৫ সেন্ট আয়ের বিনিময়ে টানা ৮-৯ ঘণ্টা ধরে এমন ৬৪টি বালতি খালি করাই ছিল তাদের রুটিন।
কিন্তু এ রুটিনে ছেদ পড়লেই দুর্ভোগে পড়তেন নগরবাসী। সিটি কাউন্সিলের কর্মীরা ধর্মঘট করলেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠত। বর্জ্য সংগ্রহ বন্ধ থাকায় পুরনো বালতি বদলে নতুনটি পাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের নিজেদের সেটি রাস্তার পাশে নিয়ে অপেক্ষা করতে হতো সংগ্রহের গাড়ির জন্য। কখনো ভারি বৃষ্টির সময় দীর্ঘ অপেক্ষার ঝামেলা এড়াতে কেউ কেউ বালতির বর্জ্য পাশের নর্দমায় ফেলে দিতেন। এতে সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি হতো বাড়তি ঝুঁকি। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, তৎকালীন নগরজীবনে বর্জ্য অপসারণ কেবল পরিচ্ছন্নতার বিষয় ছিল না; বরং দৈনন্দিন দুর্ভোগেরও একটি বড় উৎস ছিল।
অদ্ভুত বিষয় হলো, তৎকালে এ বর্জ্যেরও আলাদা অর্থনৈতিক মূল্য ছিল। কেননা মানুষের বর্জ্য কেবল তখন অপসারণের বস্তু ছিল না; কৃষিকাজেও এর ব্যবহার ছিল। স্থানীয় কৃষক এবং খামার ও বাগানের মালিকেরা রাবারগাছ ও আনারস চাষের সার হিসেবে এসব বর্জ্য কিনতেন। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কৃষিজমিতে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ে আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মানুষের মলমূত্র সার হিসেবে বিক্রি নিষিদ্ধ করেন। ফলে সংগ্রহকারীদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বন্ধ হয়ে যায়।
জনস্বাস্থ্যের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষকে প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে স্যানিটেশন অবকাঠামোর আধুনিকায়নে মনোযোগী করে তোলে। এরই অংশ হিসেবে পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের কাছাকাছি বসবাসকারী বাড়িগুলোয় ফ্লাশ টয়লেট ও বেসিনসহ প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা স্থাপনের নিয়ম চালু হয়। অন্যদিকে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা বাড়িগুলোর পেছনে গলি নির্মাণ করে সিঙ্গাপুর ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (এসআইটি), যাতে নাইট সয়েল সংগ্রহকারীদের বর্জ্যভর্তি বালতি নিয়ে ঘরের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে না হয়।
এসব উদ্যোগ শহরের পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের পাশাপাশি বর্জ্য অপসারণের পুরনো পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে। তবে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে নাইট সয়েল সংগ্রহকারীদের জীবিকায়ও। ফ্লাশ টয়লেট ও পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হচ্ছিল, হাতে করে মানুষের বর্জ্য সংগ্রহের প্রয়োজন ততই কমছিল। শহরের আধুনিকায়ন তাদের কাজকে সহজ করে দেয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সে কাজের প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত করে দিচ্ছিল।
অবশ্য আধুনিকায়নের এ যাত্রা ছিল ধীর ও অসম। সিঙ্গাপুরের সব এলাকায় তখনো পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি; ফলে নতুন ব্যবস্থার সূচনা হলেও পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। শহর যখন ধীরে ধীরে আধুনিক স্যানিটেশনের দিকে এগোচ্ছিল, তখনো তারই কিছু প্রান্তে টিকে ছিল বালতিনির্ভর শৌচাগার, আর সেগুলো পরিষ্কারের শ্রমসাধ্য ব্যবস্থা।
এ পরিবর্তনের মধ্যেই সিঙ্গাপুরে আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিস্তার ঘটতে থাকে। ১৯৬১ সালে টিওং বাহরু এলাকায় এসআইটির নির্মিত নতুন আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোয় যুক্ত হয় আলাদা শোয়ার ঘর, বসার ঘর, রান্নাঘর ও শৌচাগারের সুবিধা। এসব ফ্ল্যাটের শৌচাগার ছিল তৎকালীন প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। মেঝেতে গর্ত থাকলেও সেখানে বর্জ্য জমিয়ে রাখার বালতি ব্যবহার করা হতো না; বরং পানি প্রবাহের মাধ্যমে বর্জ্য সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা ছিল।
ধাতব চেইন টানলে প্রবল বেগে পানি নেমে শৌচাগারের বর্জ্য সরিয়ে দিত, পরে সেখানে আবার জমা হতো পরিষ্কার পানি। ফলে মানুষের বর্জ্য হাতে করে সংগ্রহ ও বহন করার প্রয়োজন কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়। নগর স্যানিটেশনের ইতিহাসে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—বর্জ্য অপসারণের শ্রমনির্ভর পদ্ধতি থেকে পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোভিত্তিক ব্যবস্থায় উত্তরণের সূচনা।
তবে আধুনিক শৌচাগারের ব্যবহার শুরু হলেও এর সুফল তখনো সিঙ্গাপুরের সর্বত্র পৌঁছায়নি। একটি কার্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু বাড়িতে ফ্লাশ টয়লেট স্থাপন যথেষ্ট ছিল না; প্রয়োজন ছিল বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য বিস্তৃত অবকাঠামো। এ লক্ষ্যেই ষাটের দশকের শেষ দিকে সরকার কিম চুয়ান, উলু পান্ডান, ক্রানজি, সেলেতার, বেদক ও জুরংয়ে ছয়টি পয়োনিষ্কাশন পরিশোধনাগার নির্মাণ ও পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়।
কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণের পরও পুরো ব্যবস্থার সম্প্রসারণে সময় লাগে। ষাটের দশকের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরের প্রধান গণপয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের আওতায় ছিল জনসংখ্যার মাত্র ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ, আধুনিক স্যানিটেশন অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ তখনো এর বাইরে ছিলেন। ফলে নতুন আবাসনগুলোয় ফ্লাশ টয়লেটের ব্যবহার বাড়লেও পুরনো ও অপরিকল্পিত বসতিগুলোয় বালতিনির্ভর শৌচাগার এবং হাতে করে বর্জ্য সংগ্রহের প্রচলন টিকে ছিল। সিঙ্গাপুরের এ অভিজ্ঞতা দেখায়, স্যানিটেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন কেবল প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়; এর সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং নগরজুড়ে সেবার বিস্তার।
পরবর্তী দুই দশকে সিঙ্গাপুরের নগরায়ণ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত থাকে। এ উন্নয়নের প্রভাব পড়ে নাইট সয়েল সংগ্রহকারী শ্রমিকদের কাজে। একসময় যেসব দোকানবাড়ি ও আবাসিক এলাকায় তাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল, সেসব জায়গায় ধীরে ধীরে আধুনিক শৌচাগার ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু হয়।
ফলে আশির দশকে এসে নাইট সয়েল সংগ্রহকারীদের পেশা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছিল। আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিস্তারে শহরের অধিকাংশ এলাকায় তাদের আর প্রয়োজন পড়ছিল না। তবে কালাং বেসিন ও সিঙ্গাপুর নদীর আশপাশের বস্তি এলাকায় তখনো কিছু মানুষ মেঝেতে গর্ত করা শৌচাগার ও মলমূত্র রাখার বালতির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এসব মানুষের প্রয়োজনেই টিকে ছিল পেশাটির শেষ অবশিষ্ট অংশ। একদিকে শহরের পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ছিল স্বস্তির খবর, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে আসা কাজ ও জীবিকা হারানোর অনিশ্চয়তা—এ দুই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল নাইট সয়েল সংগ্রহকারীদের।
তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরে তখনো প্রায় ১০ হাজার নাইট সয়েল টয়লেট ছিল। কালাং এলাকার প্রায় ৪০ হাজার বস্তিবাসীর মধ্যে এসব টয়লেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার হতো। সিঙ্গাপুর নদীর আশপাশেও ছিল প্রায় চার হাজার টয়লেট। ফলে নগরজীবনের মূল স্রোত থেকে পেশাটি ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকলেও এসব সংগ্রহকারীর কাজ তখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। শহরের একাংশে তাদের শ্রমের প্রয়োজন ছিল, অথচ বৃহত্তর নগর ব্যবস্থায় তাদের পেশার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছিল।
অবশেষে ১৯৮৭ সালে লোরং হালুসে মলমূত্র নিষ্পত্তির সর্বশেষ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে নাইট সয়েল সংগ্রহের দীর্ঘদিনের পেশাটির কার্যত অবসান ঘটে। আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা শহরকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর করে তোলার পথে এগিয়ে গেলেও এ পরিবর্তনের আড়ালে হারিয়ে যায় একদল শ্রমজীবী মানুষের পরিচিত জীবিকা। যে কাজ একসময় নগরের দৈনন্দিন জীবন সচল রাখতে অপরিহার্য ছিল, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়নে একসময় সে কাজের আর প্রয়োজন থাকল না। নগরসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন; তবে সে পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এমন কিছু মানুষের জীবিকার অবসান, যাদের শ্রম দীর্ঘদিন ধরে শহরের স্যানিটেশন ব্যবস্থার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিল।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা
