সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানি ছড়ানোর পর ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো গ্রেফতার হননি। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, তিনি ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি করেন। এতে ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরো ২০০ থেকে ২৫০ জনকে।
গ্রেফতার দুজন হলেন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মোক্তার হোসেন ও আসাদুল মোল্লা। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন বলেন, উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রাম থেকে মোক্তারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নাজিরের ঘের নামের স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয় আসাদুলকে। দুজনই এজাহারভুক্ত আসামি। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টাও চলছে।
মামলার এজাহার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জেরে গালিগালাজ করেন মানসিক রোগে আক্রান্ত শামীম। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁর কথাবার্তার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই অডিওতে কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে এসে ‘তৌহিদী জনতা’কে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর উত্তেজিত একদল মানুষ শামীমের বাড়ির ফটক ভাঙচুর করে তাঁকে বাজারে নিয়ে মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে শামীম বিষপান করেন। রাতে তাঁকে কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। সেখানে পাকস্থলী পরিষ্কারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল।
তবে মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনী ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে আবারো মারধরের অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও হামলা থামেনি। আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে গিয়ে হামলা চালায়। এ সময় চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছড়ে ফেলে বাইরে নিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতারের কথা তাঁরা জানতে পেরেছেন। অন্য যারা জড়িত, তাঁদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জেনেছেন। এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মামলার এজাহারের বিস্তারিত জানতে চাইলে তাওসিফ বলেন, তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতারের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করতে পুলিশ অনুরোধ জানিয়েছে। এ কারণে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করতে চান না তাঁরা।
প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাওসিফ। তাঁর অভিযোগ, আমিনী এখনো ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন।
দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনীর ফেসবুক প্রোফাইলের নাম ‘এফএইচ আমেনি’। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটেও ওই প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এতে ফজলুল হক লেখেন, “আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যেকোনও সময় আমাকে গ্রেফতার করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন। তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না, যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন। এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন।”
এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২২ মিনিটে শামীমকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন ফজলুল হক আমিনী। ওই পোস্টের সঙ্গে শামীমের একটি কথোপকথনের অডিও যুক্ত করেন তিনি। এরও আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে দেওয়া আরেকটি পোস্টে শামীমের মানসিক অসুস্থতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি।
সানা/আপ্র/কেএমএএ/১৬/১০/২০২৬
