অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার, নিয়োগ-বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কোনোটি তদন্তাধীন, কোনোটি যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে, আবার কোনো অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।
প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক ডেপুটি প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগের কথা আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের পরিবর্তে যাচাইযোগ্য তথ্য, নথিপত্র এবং তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরুর খবর সামনে এসেছে। অভিযোগে বিদেশে অর্থপাচার, বিভিন্ন নিয়োগ ও পদায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসক পদায়ন, প্রকল্পের টেন্ডার এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা জরুরি। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও ন্যায়বিচারের অংশ।
বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনা, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনা এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয় রয়েছে। কয়েকটি অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদ অর্জনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিদেশে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বৈধ আয়ের অর্থে বিদেশে সম্পদ অর্জন এবং অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই কেবল সম্পদ কেনার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত।
এ ছাড়া সাবেক উপদেষ্টা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে বিটিসিএলের ফাইভ-জি উপযোগীকরণ প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুদকের অনুসন্ধানে হস্তক্ষেপের অভিযোগে মামলা করার সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের একজন সহকারী একান্ত সচিব ও তথ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব ক্ষেত্রে অনুসন্ধান বা মামলা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণ জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন
বিদেশে অর্থ স্থানান্তর নিয়ে আলোচনার মধ্যে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির তথ্যও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের নামে জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়ায়, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এই হিসাবে এক বছরে জমার পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বৃদ্ধি পেলেই তা সরাসরি অর্থপাচারের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এই অর্থের প্রকৃতি, হিসাবধারীদের পরিচয়, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈধভাবে বিদেশে রাখা অর্থের সঙ্গে অবৈধভাবে স্থানান্তরিত অর্থের পার্থক্য নিরূপণ করতে হবে। অর্থপাচারের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব মওকুফ-সংক্রান্ত অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, প্রযোজ্য আইন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথি এবং সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, থাকলে তা কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়ম বা বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
এসব অভিযোগের কোনোটি যদি নির্দিষ্ট নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিমাণ, সম্পদের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সংখ্যা বা অঙ্ক যত বড়ই হোক, তদন্তের ফলাফল ছাড়া সেগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রচার করা সমীচীন নয়।
দুদকের ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব হলো দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে তার অগ্রগতি, প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যথাসম্ভব স্বচ্ছতা থাকা দরকার। আবার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়া গেলে সেটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা উচিত।
সরকার পরিবর্তনের পর আগের সরকারের কর্মকর্তা ও উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার অবস্থান যেন তদন্তের মানদণ্ড নির্ধারণ না করে। একই আইনি প্রক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তিনি প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত—এ কারণে যেমন তদন্তে ছাড় দেওয়া যাবে না, তেমনি অভিযোগের ভিত্তিতেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, কর-সুবিধা এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুদকের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত। তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই কমিশনকে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের মানুষ দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দেখতে চায়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা, কর্মকর্তা কিংবা অন্য যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকুক না কেন, তার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অভিযোগের দায় থেকে মুক্ত রাখার প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সাউথ এশিয়ান ল’ইয়ার্স ফোরাম ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি।
