পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও বিভিন্ন খাতের জনদুর্ভোগকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরির চেষ্টায় ব্যস্ত বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির নেতাদের অভিযোগ, ছোট-বড় সংকটকে পুঁজি করে বিরোধী দলসহ একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতিকে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পতিত স্বৈরাচারের দোসররা ও সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ জাতীয় নাগরিক পার্টি সাধারণ মানুষের
আবেগ-নিত্যদিনের ছোট-বড় সমস্যাগুলোকে উসকে দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এ ছাড়া সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ে চেষ্টা করছে। অথচ বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো বর্তমান সংকটের মূল ভিত্তি। যেখানে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর বাজারেও।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^ চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, সরকার পরিচালনা করতে প্রতিবন্ধকতা থাকবে। সরকারের সাত-আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় ছিল দুর্গাপূজা ঘিরে। তখন একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ও সরকারের কৌশলগত দিকগুলো সঠিক ছিল বলেই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পূজা সম্পন্ন হয়। তখন সরকার জনগণকে আস্থায় আনতে পেরেছিল; যে কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একটা দুর্ঘটনা ঘটে নাই পূজাচলাকলীন; যা পার্শ্ববর্তী দেশও প্রশংসা করেছে।
বিএনপির এই বর্ষীয়ান নেতা বলেন, ষড়যন্ত্র থাকবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সরকারের কৌশল থাকতে হবে; সেই কৌশলে জনগণকে আস্থায় রেখে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের প্রতি সরকারের যেমন দায় আছে; সেই সরকারকে নেতৃত্বে রাখারও কিন্তু জনগণের একটা দায়িত্ব আছে। এই জায়গাটার মধ্যে যদি কনফিউশন না হয় তাহলে কোনো ষড়যন্ত্র সরকারকে দুর্বল করতে পারবে না। যেমন- এবার জনশূন্য এলাকার পূজামণ্ডপেও কেউ হাত দিতে সাহস পায়নি। কেননা এখানে ক্ষমতাসীন দল সরকারকে সহযোগিতা করেছে। দলের প্রত্যেকটা স্তরে প্রত্যেকটা মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটা সিকিউরিটি বলয় তৈরি করেছিল। সরকারি প্রশাসনের বাইরেও এই সিকিউরিটিটা ছিল শক্ত ও বেশ কার্যকর। এই অর্জন থেকে সরকার শিক্ষা নিতে পারে যে, সমস্যা মোকাবিলা কোন প্রক্রিয়ায় করতে হয়। যে প্রক্রিয়াটা অবলম্বন করছে এটা যদি অব্যাহত রাখতে পারে জনগণের সরকার জনগণ টিকিয়ে রাখবে। বিরোধী দল বিরোধিতা করবে ওটাকে ভয় বা গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। আমি মনে করি একটা সরকার সুশাসন যত দিতে পারবে, জনগণের চলার পথ যত নিরাপদ করতে পারবে ততই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। শুধু রাস্তাঘাট আর বড় বড় বিল্ডিং নির্মাণ করলে জনগণ সন্তুষ্ট হয় না।
সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আমাদের সময়কে বলছেন, চতুর্মুখী সংকট ও চক্রান্তের মধ্যেও বর্তমান সরকার বেশকিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। যার মধ্যে ধসে পড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো বড় সাফল্য। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা ও ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ কমিয়েছে। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করতে পুরোদমে কাজ করছে সরকার। এমনকি কূটনৈতিক সাফল্যে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে এবং বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকারের এই ৭-৮ মাসের মধ্যে বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখিয়েছে। নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও এই অগ্রযাত্রা দেশের মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমান সরকার সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিচ্ছে দাবি করে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, সরকারের এই কয়েকমাসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে ৭০ হাজারেরও বেশি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীদের মাসিক ২,৫০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। ১২ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণ মওকুফের পাশাপাশি ‘ফার্মার কার্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোকে আইসিইউ সুবিধাসহ ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে। বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের জন্য অর্থের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি সেচের সুবিধার্থে সারাদেশে প্রথম পর্যায়ে ২,১৬৫ কিলোমিটার এবং পরবর্তীতে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মেগা প্রজেক্ট চালু হয়েছে। ঢাকার ট্রাফিক জট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্যামেরা স্থাপন এবং ঢাকার বাইরে ৪টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো সমাজ, রাষ্ট্র বা সংগঠনে যখন কোনো সমস্যা বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকে, তখন তা একটি জটিল ‘জঞ্জাল’ বা পুঞ্জীভূত জটলায় পরিণত হয়। পতিত আওয়ামী লীগসহ বিগত শাসনব্যবস্থায় রেখে যাওয়া দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোর তাৎক্ষণিক বা রাতারাতি সমাধান কোনো অলৌকিক উপায়েও সম্ভব নয়। কারণ বহুবছরের পুরনো সংকটকে উপড়ে ফেলতে না পারার পেছনে বেশকিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় জড়িয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম চলতে থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা ভেঙে পড়ে। জোড়াতালি দিয়ে চলা এই ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে সাজাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য যে পরিমাণ দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং আর্থিক তহবিলের প্রয়োজন, তা রাতারাতি জোগাড় করাও অসম্ভব। বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া ক্ষত নিরাময়ে সময়ও লাগবে সমানুপাতিক, বরং তড়িঘড়ি করে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে এবং সংকটের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। টেকসই আইনি সংস্কার, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে তবেই এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, এই কয়েকমাসে মাসে প্রমাণিত হয়েছে যে, সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে বর্তমান সরকার মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। পতিত আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতি নির্মূল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কাজেই কে কী বলল এতে সরকারের কিছু আসে যায় না, বরং বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ। আশা করি ওনার এই কাজ কর্মের প্রতিফলনস্বরূপ দেশের সর্বস্তরের মানুষ সরকারকে সমর্থন দেবেন।
এদিকে সরকারি দল ও সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের কর্মকাণ্ড এবং বিরোধী দলের ভূমিকায় চিরকালই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্ক বিদ্যমান থাকে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও যুক্তি সামনে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সমর্থকদের মতে, সরকার দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন দৃশ্যমান পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে চলেছে। তাদের অভিযোগ, প্রধান বিরোধী দলসমূহ সরকারের এসব অর্জনকে ম্লান করতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
সংসদে এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় বিরোধী দলসমূহ (যেমন : জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দল) এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়গুলো রাজপথে ও সংসদে তুলে ধরছেন তারা। তাদের মতে, নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগ আড়াল করতেই সরকার বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, একটি কার্যকর ও পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য সরকারের স্বচ্ছতা এবং বিরোধীদলের গঠনমূলক সমালোচনা- উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষই যেন রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি না করে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, সেটিই বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে জরুরি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আমাদের সময়কে বলেন, বিরোধী দল তাদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা করছে। সরকার তাদেরকে সঠিক পথে আনতে চেষ্টা করছে। তারা যদি নাই শোনে, বরং আগের মতোই নিজেদের খেয়ালিপনা করে তাহলে দেশের আরও বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা মনে করি, ভুল পথ থেকে ফেরার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে; সেই সময়ের মধ্যে যদি না ফেরে তাহলে সাধারণ মানুষই তাদেরকে ফেরানোর ব্যবস্থা করবে।
