মার্কিন সামরিক বাহিনী দণ্ডপ্রাপ্ত এক ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি ইন্টারনেটে সম্প্রচারের পরিকল্পনা করছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সাবেক মার্কিন আর্মি মেজর নিদাল হাসানকে আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের (গুলি করে) মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দিন ধার্য রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, এই মৃত্যুদণ্ড অনলাইনে সরাসরি দেখানো হলে তা ভবিষ্যতে হামলা চালাতে চাওয়া অপরাধীদের জন্য কড়া সতর্কবার্তা ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার জানান, তিনি নীতিগতভাবে এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি। এটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনও অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের প্রথম ঘটনা ঘটবে। তবে একটি বীভৎস মৃত্যুকে সরাসরি দেখানোর এই সিদ্ধান্ত আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন তুলেছে।
ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা ও মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিদাল হাসানকে আইনি পরামর্শ দেওয়া বেসামরিক আইনজীবী জন গ্যালিগান জানান, পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্রের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখে তিনি প্রথম নিদালকে সাজা কার্যকরের তারিখটি নিশ্চিত করেন।
গ্যালিগান বিবিসি-কে বলেন, পুরো বিষয়টিকে একটি ‘সার্কাস’ বা উদযাপনের মতো দেখা হচ্ছে, যা মধ্যযুগীয় গণপিটুনির মানসিকতার রূপ নিচ্ছে।
কে এই নিদাল হাসান এবং তার উদ্দেশ্য কী ছিল?
ভার্জিনিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা নিদাল ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির এক ভিড়ে ঠাসা মেডিকেল ভবনে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যা করার কথা স্বীকার করেন।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে শুনানিকালে নিদাল জানান, আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাত থেকে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষা করতেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন। হামলায় পুলিশের গুলিতে নিদাল নিজেও আহত হন এবং বর্তমানে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহার করছেন।
২০০৯ সালের ৫ নভেম্বরের সেই হামলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটিতে অ-যুদ্ধকালীন সময়ের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এতে ১৩ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও ৩২ জন সেনাসদস্য আহত হন।
সবাই কি ‘সরাসরি সম্প্রচার’ দেখতে পারবে?
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সরাসরি সম্প্রচারের দৃশ্য কারা দেখতে পারবেন, তা এখনও স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। এক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না, সেটিও জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্যভেদে এবং সামরিক বাহিনীর নিজস্ব নিয়মে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং প্রত্যক্ষ করার ভিন্ন আইন রয়েছে। সামরিক নীতি ‘আর্মি রেজল্যুশন ১৯০-৫৫’ অনুযায়ী, কেবল সাংবাদিক ও নিকটাত্মীয়দের মতো নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তবে এটি সরাসরি প্রচার করা হলে বা পরে অনলাইনে ক্লিপ ছড়িয়ে পড়লে শিশুদের দেখা থেকে বিরত রাখা অসম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফোর্ট হুড হামলায় ৭টি গুলি খেয়ে বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনাসদস্য অ্যালোনজো লান্সফোর্ড তরুণ প্রজন্মের ওপর এর মানসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি সম্প্রচার বন্ধের দাবি জানান। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সেন্সরবিহীনভাবে এটি দেখার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মতামত দেন তিনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, গত বছর ১৭টি দেশে ২,৭০০টির বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও মাত্র দুটি দেশ তা জনসমক্ষে কার্যকর করেছে। ২০২৫ সালে ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ৬টি মৃত্যুদণ্ড জনসমক্ষে কার্যকর করা হয়।
সরাসরি সম্প্রচার কি আইনিভাবে বৈধ?
জাতিসংঘ শুক্রবার সতর্ক করে জানিয়েছে, অনলাইনে মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচার আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তি’ হিসেবে বিবেচিত হবে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, ক্যামেরার সামনে বা জনসমক্ষে কোনও সরকারের এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ভাবনা অত্যন্ত গর্হিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কীভাবে বা কোথায় এটি সম্প্রচার করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ উদ্যোগে দেশটির আইন বা বিধিমালা লঙ্ঘিত হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর নিজস্ব নীতিমালায় সহিংসতা ও মৃত্যু প্রদর্শনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ট্রাম্পের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সরাসরি সম্প্রচার করার সুবিধা নেই।
হোয়াইট হাউজের বিভিন্ন জনপ্রিয় অনলাইন মাধ্যমে সরকারি অ্যাকাউন্ট ও চ্যানেল রয়েছে। এসব মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে মেটা, ইউটিউব, টিকটক ও এক্স।
তবে এই সব মাধ্যমেই সহিংস দৃশ্য ও ভিডিও প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মৃত্যু দেখানো, সহিংসতাকে উপভোগ্য করে তোলা কিংবা দর্শকদের বিনোদনের বিষয় হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
অন্যদিকে, গুগল মালিকানাধীন ইউটিউবে এমন কোনও দৃশ্য বা ভিডিও প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, যা দর্শকদের আতঙ্কিত করতে পারে। তবে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকতে পারে বলে জানিয়েছে ইউটিউব।
টিকটকেও এ ধরনের দৃশ্য প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালায় বলা হয়েছে, অতি ভয়াবহ, সহিংস বা অস্বস্তিকর কোনো দৃশ্য প্রকাশ করা যাবে না। বিশেষ করে, যেসব দৃশ্য দর্শকদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে সেগুলো নিষিদ্ধ।
নিষিদ্ধ দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে কারও মৃত্যুর মুহূর্ত এবং কিউকে গুলি করার দৃশ্য। তবে দুই সপ্তাহ আগে টিকটক তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। এতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অতি ভয়াবহ দৃশ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় সম্ভাব্য ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে।
হঠাৎ এই জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ডের পরিকল্পনা কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে গুলি করে অথবা বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি রয়েছে।
তবে দেশটিতে বেশিরভাগ মৃত্যুদণ্ড বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রাণঘাতী ওষুধের একাধিক উপাদান শরীরে ঢুকিয়ে কার্যকর করা হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
ওষুধ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, অপব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ওষুধ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি টেনেসি রাজ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতক ক্রিস্টা পাইকের ইনজেকশন প্রয়োগে মৃত্যুদণ্ড চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কেন এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দণ্ডিত বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প পদ্ধতি কী হতে পারে, তা নিয়ে ভাবছেন কর্মকর্তারা। ওই ঘটনার ঠিক পাঁচ দিন পর, ৫ অক্টোবর পেন্টাগন নিদাল হাসানকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে সমর্থন জানালেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সংশয় প্রকাশ করে জানান, এটি আদৌ ঘটবে কি না তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন এবং নিজে এটি দেখবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রে সবশেষ জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কখন হয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্রে সবশেষ জনসমক্ষে সবচেয়ে বড় আয়োজনে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ১৯৩৬ সালে কেন্টাকিতে। রেইনি বেথিয়া নামের এক দণ্ডপ্রাপ্তকে প্রায় ২০ হাজার মানুষের সামনে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
এছাড়া, ১৯৩৭ সালে মিজৌরিতে একটি ভবনের ভেতর প্রায় ৫০০ মানুষের সামনে রসক ‘রেড’ জ্যাকসনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা হবে ১৯৬১ সালের পর মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফায়ারিং স্কোয়াডে কোনো সেনাসদস্যের দণ্ড কার্যকর করার প্রথম ঘটনা।
