দূর-পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার রুক্ষ ও প্রতিকূল প্রান্তর। খরা, তীব্র আবহাওয়া আর সীমিত সম্পদ নিয়ে যেখানে প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালাতে হয়, সেখানেই হাজার বছর ধরে এক অনন্য ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কাজাখ যাযাবরেরা। ঠিক কবে থেকে এর শুরু, তা স্পষ্ট নয়। তবে অনুমান করা হয়, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে এই প্রান্তরেই কোনো এক সময় শিকারি পাখি পোষ মানানো শুরু হয়েছিল, যা পরে ‘ফ্যালকনরি’ বা পাখি দিয়ে শিকারের রূপ নেয়।
বিশ্বের অনেক জায়গায় ফ্যালকনরিকে ‘রাজাদের খেলা’ বা রাজকীয় বিনোদন হিসেবে দেখা হলেও, এই যাযাবরদের কাছে এটি কোনো শখ বা খেলা নয়। এটি তাদের বেঁচে থাকার বাস্তব লড়াই। পেশাদার শিকারিরা সাধারণত ছোট জাতের ফ্যালকন বা বাজপাখি ব্যবহার করেন, কিন্তু কাজাখ যাযাবরেরা শিকারের কাজে বেছে নেন বিশাল ও শক্তিশালী ‘সোনালি ঈগল’।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলে, মধ্য এশিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকেই পাখির সাহায্যে শিকারের চল ছিল। ফলে এই অঞ্চলটি মানুষ ও শিকারি পাখির যৌথ সম্পর্কের অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে এই প্রথা পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানকার রাজদরবার ও সামরিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
মধ্যযুগের ইউরোপে এটি শুধুই রাজকীয় বিনোদনে পরিণত হয়েছিল। তবে মঙ্গোলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় কাজাখদের কাছে ঈগল শিকারের আদি ও মূল উদ্দেশ্যটি আজও বদলায়নি। তাদের এই চর্চা সরাসরি মাটির সঙ্গে, জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। মঙ্গোলিয়ার বায়ান-উলগি প্রদেশটি চীন, রাশিয়া ও কাজাখস্তানের সীমান্ত ঘেঁষে আলতাই পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা এক দুর্গম এলাকা। এটি পাহাড়ি ছাগল আর অধরা তুষার চিতাবাঘের প্রাকৃতিক আবাস। এখানকার গ্রীষ্মকাল খুব সংক্ষিপ্ত ও উষ্ণ, আর শীতকাল দীর্ঘ ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। এখানকার আধা-যাযাবর কাজাখ জনগোষ্ঠীর মানুষ বছরজুড়ে গবাদি পশু—ভেড়া, ছাগল, উট, ইয়াক ও ঘোড়া নিয়ে এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ান।
ঐতিহ্যগতভাবেই এই সমাজে নারী-পুরুষের কাজের স্পষ্ট ভাগ রয়েছে। নারীরা ঘরের কাজ ও রান্নাবান্না সামলান। আর পুরুষেরা গবাদি পশু চড়ান এবং ঘোড়ার পিঠে চেপে ঈগলের সাহায্যে শেয়াল বা অন্যান্য পশমওয়ালা প্রাণী শিকার করেন। এই ঈগল শিকারিদের স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বার্কুচি’।
জীববিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী লরেন ম্যাকগফ ২০০৯ সালে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে প্রথম এই অঞ্চলে যান। হাতে গোনা কয়েকজন বিদেশি এবং অতি অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যে তিনি একজন, যিনি বার্কুচিদের শিষ্য হয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঈগল দিয়ে শিকারের কৌশল শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।
লরেন বলেন, “এখানকার ৯০ শতাংশের বেশি জমি চাষবাসের যোগ্য নয়। তাই ফসল ফলানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর বদলে তারা এক অসাধারণ উপায় বের করেছেন। গৃহপালিত পশুপাখি থেকে শুরু করে বন্য ঈগল, সবার সঙ্গেই এক চমৎকার পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এই সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই তারা বেঁচে থাকার সব প্রয়োজন মেটান।”
সব পুরুষ চাইলেই ঈগল শিকারি হতে পারেন না। এই পেশায় আসা অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। স্থানীয়দের মতে, এর জন্য মনের ভেতর থেকে একটা ‘ডাক’ আসতে হয়। ভালোবাসা ও টান না থাকলে এই সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। এটি শুধু কাজ নয়, নিজের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানানোর এক বড় উপায়।
তবে স্থানীয়রা ভালো করেই জানেন, এই পথ বেছে নেওয়া মোটেও সহজ নয়। যাযাবরদের দৈনন্দিন জীবন এমনিতেই পশু চড়ানো, নদী বা জমে থাকা বরফ কেটে খাওয়ার পানি আনা, জ্বালানির জন্য পশুর গোবর কুড়ানো এবং ঘর গরম রাখার মতো কঠিন পরিশ্রমে ভরা। তাই সাধারণত বয়স বাড়লে এবং বড় ছেলেরা পশুপালনের দায়িত্ব নিলে অভিজ্ঞ প্রবীণ পুরুষেরা পুরোদমে ঈগল পোষা ও ওড়ানোর কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন।
ঈগল শিকারি হওয়ার প্রথম পাঠ হলো ওস্তাদের ঈগলের যত্ন নেওয়া। যেমন শিকার না পেলে সন্ধ্যায় তাকে পরম মমতায় খাওয়ানো। এরপরের কাজ হলো ঝোপঝাড় থেকে শেয়াল তাড়িয়ে বের করা, যাতে ঈগল সহজে শিকার করতে পারে। এই কাজগুলোতে অনুগত ও নিবেদিত প্রমাণ করতে পারলে, অভিজ্ঞ শিকারিরা সেই তরুণকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল থেকে নতুন বন্য ঈগল ধরতে সাহায্য করেন।
ঈগল শিকারিরা প্রায় সবাই পুরুষ হলেও, শিকারের জন্য বেছে নেওয়া হয় শুধু স্ত্রী ঈগলদের। কারণ স্ত্রী ঈগল আকারে বড় ও বেশি চটপটে হয়। সাধারণত শরৎকালে রাশিয়া থেকে চীন যাওয়ার পথে আলতাই পর্বতমালা পার হওয়া বয়ঃসন্ধিকালের ঈগলগুলোকে ফাঁদ ও মরা শেয়ালের টোপ দিয়ে ধরা হয়।
লরেন জানান, উপযুক্ত কৌশল জানা থাকলে ঈগলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া খুব কঠিন নয়। নতুন ধরা ঈগলকে শান্ত রাখতে প্রথমে তার মাথায় চামড়ার তৈরি বিশেষ টুপি বা ‘হুড’ পরিয়ে দেওয়া হয়। ঈগলের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর হওয়ায় চোখ ঢেকে দিলে তারা শান্ত থাকে। প্রশিক্ষণের শুরুতে আবছা আলোয় ঘরের ভেতর ঈগলের মাথার টুপি খুলে হাতে মাংস দেওয়া হয়। খুব দ্রুতই পাখিটি গ্লাভস পরা হাত থেকে খাবার খেতে শিখে যায়। এরপর ধীরে ধীরে তাকে হাতে এসে বসতে শেখানো হয়, পরে দড়ি বেঁধে অল্প দূরত্ব থেকে উড়ে আসতে বলা হয় এবং আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়ানো হয়।
ঈগল যখন প্রায় একশ ফুট দূর থেকে উড়ে এসে শিকারে হাতে বসতে শেখে, তখন তাকে খোলা আকাশে ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ততদিনে পাখিটির কাছে শিকারি একজন নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। পাখিটি যখন বোঝে যে এই মানুষটার সঙ্গে থাকলেই সহজে খাবার বা শেয়াল পাওয়া যাবে, তখন সে আর শিকারিকে ছেড়ে যায় না।
একজন শিকারি একবারে একটিমাত্র ঈগল পুষে থাকেন এবং পুরো শীতকাল জুড়ে তাকে নিয়ে শিকার করেন। শেয়াল ধরার পর পশমটুকু শিকারি রেখে দেন আর মাংসটুকুই ঈগলকে খেতে দেন। গ্রীষ্মকালে ঈগলের পালক ঝরে নতুন পালক গজায়, তাই এই সময়ে শিকার বন্ধ থাকে। তখন ঈগলকে প্রচুর ভালো ভালো খাবার খাইয়ে স্বাস্থ্যবান রাখা হয়, যাতে তাদের নতুন পালক সুন্দর ও শক্ত হয়ে গজায়।
মানুষ আর ঈগলের এই বন্ধন গভীর ও ভালোবাসার হলেও, এটিকে কোনো আবেগপ্রবণ পোষা প্রাণীর সম্পর্ক বলা যাবে না। শিকারিরা তাদের ঈগলের কোনো নাম দেন না। ঈগলের প্রতি কেবল শ্রদ্ধা থাকে। এমনকি প্রথম দিন থেকেই শিকারির মাথায় থাকে যে একদিন এই পাখিকে আবার মুক্ত আকাশে ফিরিয়ে দিতে হবে।
ঈগলকে ছেড়ে দেওয়ার সঠিক সময় কোনটি, তা প্রতিটি শিকারি তার নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে বোঝেন। লরেন তার ওস্তাদের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান। একবার শিকারে বের হওয়ার পর একটি বন্য পুরুষ ঈগল এসে তাদের পোষা বয়োবৃদ্ধ স্ত্রী ঈগলটিকে ডাকতে শুরু করে। স্ত্রী পাখিটি কয়েকবার সেই ডাক শুনে আকাশে উড়লেও আবার ওস্তাদের হাতে ফিরে আসে। কিন্তু ওস্তাদ বুঝে যান, প্রকৃতির ডাক এসে গেছে এবং পাখিটিকে এবার স্বাধীন করে দেওয়ার সময় হয়েছে।
ঈগলকে মুক্ত করার আরও কারণ থাকতে পারে। হয়তো ঈগলের সঙ্গে শিকারির মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে, অথবা শিকারি নতুন কোনো ঈগলকে প্রশিক্ষণ দিতে চান। যে কারণেই হোক না কেন, বছরের পর বছর যে পাখির পেছনে এত শ্রম ও ভালোবাসা দেওয়া হয়েছে, তাকে বিদায় জানানো সবসময়ই আবেগঘন এক মুহূর্ত।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজ সংকটে। তরুণ প্রজন্ম যাযাবর জীবনের কষ্ট ছেড়ে কাছের শহর বা রাজধানী উলানবাটরে গিয়ে পড়াশোনা ও চাকরি বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে পুরো অঞ্চলে মাত্র ৭০ জনের মতো আসল ‘বার্কুচি’ বা ঈগল শিকারি টিকে আছেন। প্রতি বছর শরৎকালে পর্যটকদের জন্য একটি উৎসব আয়োজন করে তারা এই প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
লরেনের মতে, “একজন সত্যিকারের ঈগল শিকারি হতে হলে যাযাবর জীবনকে আপন করে নিতেই হবে। খোলা প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো, প্রকৃতি ও পশুপাখির গতিবিধি বোঝা, এর কোনো বিকল্প নেই।” প্রকৃতি ও মানুষের এই দুর্লভ ও সুন্দর সম্পর্কটি কালের নিয়মে হারিয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস
