আর্থিক সংকটে থাকা যুক্তরাজ্যের সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি আগামী দুই বছরে ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড (৬৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ১০০টিরও বেশি পদ বিলুপ্ত করার এবং দুটি চ্যানেল বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
বিবিসি নিউজের পরিচালক র্যাচেল জাপ এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় জানিয়েছেন যে, ১০০টিরও বেশি পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২,০০০ পদ ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এএফপি-র কাছে পাঠানো বার্তায় জাপ জানিয়েছেন, এই পদগুলো বিলুপ্ত করার ফলে ৫৫ লক্ষ (৫.৫ মিলিয়ন) পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
চলতি মাসেই তিনি বিবিসি নিউজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে, গত বছর বিবিসি-র একটি প্রামাণ্যচিত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফুটেজ বিভ্রান্তিকরভাবে সম্পাদনা করা নিয়ে বিতর্কের জেরে তাঁর পূর্বসূরি পদত্যাগ করেছিলেন।
বিবিসি আরও জানিয়েছে যে, তারা ‘বিবিসি স্কটল্যান্ড’ এবং তরুণদের জন্য তৈরি চ্যানেল ‘বিবিসি থ্রি’-এর সম্প্রচার বন্ধ করে দিচ্ছে। তবে এই চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান এখন থেকে তাদের অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘আইপ্লেয়ার’ (iPlayer)-এ দেখা যাবে।
এছাড়া ‘রেডিও ৪ এক্সট্রা’ (Radio 4 Extra) বন্ধ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এর আর্কাইভ-ভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো এখন থেকে অডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘বিবিসি সাউন্ডস’ (BBC Sounds)-এ পাওয়া যাবে।
বিবিসি-র মহাপরিচালক ম্যাট ব্রিটন কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক বার্তায় বলেন, আমাদের ওপর যে তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ রয়েছে, তা সামাল দিতে এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বিবিসি-কে নতুন রূপ দিতে প্রতিটি পাউন্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা সবাই জানি, এর অর্থ হলো কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
গুগলের সাবেক এই নির্বাহী, যিনি চলতি বছরের শুরুর দিকে বিবিসি-র দায়িত্ব নিয়েছেন, আরও বলেন, বর্তমানে তারা যে চমৎকার সব অনুষ্ঠান প্রচার করে, তার বেশিরভাগই দর্শকরা আগের মতোই ‘আইপ্লেয়ার’ এবং ‘সাউন্ডস’-এ উপভোগ করতে পারবেন।
স্কটল্যান্ডের সংস্কৃতিমন্ত্রী মাইরি ম্যাকঅ্যালান বলেছেন, ‘বিবিসি স্কটল্যান্ড’-কে পুরোপুরি অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।
এর আগে জুন মাসে বিবিসি জানিয়েছিল যে, চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ তাদের সংবাদ বিভাগ, বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক শাখা এবং কন্টেন্ট টিম থেকে আরও ৫৫০টি পদ বিলুপ্ত করা হবে, যার মাধ্যমে ১৬০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে। ২০১৭ সাল থেকে লাইসেন্স ফি—যা এই প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি বড় উৎস—তার প্রকৃত মূল্যমান প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে যাওয়ায়, বর্তমানে এটি তীব্র ব্যয় সংকটের মুখে পড়েছে।
এই সম্প্রচারমাধ্যমটি—যারা দাবি করে যে যুক্তরাজ্যের ৯৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি মাসে তাদের পরিষেবা গ্রহণ করেন—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা বিতর্ক ও কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে, যা তাদের প্রতি জনগণের আস্থাকে টলিয়ে দিয়েছে।
জাপ তার বার্তায় বলেন, “মানুষ যেভাবে খবর গ্রহণ করে তা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক দর্শক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে আমরা আর পৌঁছাতে পারছি না।”
জাপ আরও জানান, বিবিসি-র সংবাদ বিভাগকে হয়তো প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ব্যয় সংকোচন করতে হতে পারে। তিনি বলেন, “বিবিসি-র ওপর বিদ্যমান আর্থিক চাপের পরিপ্রেক্ষিতে, সংবাদ বিভাগের জন্য ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়তে পারে।”
চলতি বছরের শুরুর দিকে বিবিসি জানায় যে, আগামী তিন বছরে তাদের প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ডের বার্ষিক বাজেট থেকে ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ২ হাজার পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই করবে, যা ২০১১ সালের পর তাদের সবচেয়ে বড় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা।
