আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণহানির পর দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুথিদের মোকাবিলায় সামরিক অভিযান চালিয়েও প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন-রিয়াদ কি সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়াবে, নাকি আকাশপথে হামলা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের সামনে এখন সামরিক ও কূটনৈতিক-দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই বাড়ছে। একদিকে হুথিদের হামলা ঠেকাতে চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে বড় আকারে সেনা পাঠালে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে গত সপ্তাহে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। তবে হুথিরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ডে হামলা আরও জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর পরদিন রোববারও একই বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার খবর পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের ব্যবহৃত কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে হুথিরা হামলার পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরির কৌশলও নিতে পারে গোষ্ঠীটি।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাদের বিরুদ্ধে রিয়াদের প্রায় এক দশকের সামরিক অভিযানের সময় ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলাকে তাই শুধু সৌদি-হুথি সংঘাত হিসেবে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের বিস্তার হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবের রাজনীতি নিয়ে লেখক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেন, হুথিদের হুমকি শেষ পর্যন্ত মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী স্থলযুদ্ধে কতটা সফল হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। সৌদি আরব আকাশপথে তাদের ব্যাপক সহায়তা দিচ্ছে।
এখন পর্যন্ত হুথিবিরোধী ইয়েমেনি বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রেখেছে সৌদি আরব। সরাসরি স্থলযুদ্ধে বড় আকারে সেনা মোতায়েন করেনি দেশটি। তবে রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর এই সংযম বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইয়েমেনে বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠালে সৌদি আরবকে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। এতে দেশটির অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নত হচ্ছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা
দুই দশক আগেও হুথিরা ছিল ছোট একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণপন্থি আন্দোলন। ইরানের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে তারা শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা দিয়ে ইসরায়েলের তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করা দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, গোষ্ঠীটি যুদ্ধের কৌশল উন্নত করেছে। তাদের হামলা আগের তুলনায় আরও আধুনিক ও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা ও গোয়েন্দা তৎপরতাও বেড়েছে। ইয়েমেনের সরকার অভিযোগ করেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে হুথিরা।
ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে উড়তে পারে। এগুলোতে তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থা রয়েছে, যার সাহায্যে তাপের উৎস অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। তবে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হুথিদের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লদ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। উড্ডয়নের সময় অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ওই গোষ্ঠী উত্তর ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থান করায় তাদের সঙ্গে হুথিদের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
সহায়তা চাইছে সৌদি আরব
হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা চেয়েছে সৌদি আরব। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো মিত্র দেশও সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিরিয়ার কাছেও সহায়তা চেয়েছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়া থেকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে হটিয়ে দেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তবে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেয়নি। এর পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে সহায়তার জন্য নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীনে ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচল আবার শুরু হয়।
সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার কথা বলেন সৌদি যুবরাজ। ওই সময় তিনি হুথিদের ওপর হামলা চালাতে ট্রাম্পকে আহ্বান জানান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে সম্মত হননি।
আলী শিহাবির মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নিলে সৌদি আরবের জন্য তা সহায়ক হবে। কারণ, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে মার্কিন বিমানবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। সৌদি বিমানবাহিনীকে সেই প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি সময় নিয়ে কাজ করতে হয়।
ড্রোন হামলায় ঝুঁকিতে সৌদি অবকাঠামো
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম দেশগুলোর একটি সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশটি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিস্তীর্ণ মরুভূমিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তুলনামূলক কম খরচে তৈরি একমুখী ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। রোববার সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। আগের দিনের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। পরদিনও বিমানবন্দর এলাকায় নতুন হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হামলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে তার মতে, হামলাটি ছিল ভয়াবহ। হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতেও পারি।’রিয়াদের বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো-নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি সরাসরি সামরিক অভিযান বাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া। দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের গতিপথ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, আল জাজিরা।
