সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করে ফেসবুক লাইভে লোক জড়ো করে দুই দফা গণপিটুনি দিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি হত্যা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। এর আগে সন্ধ্যায় উপজেলার কুলিয়া এলাকায় তাকে প্রথম দফা গণপিটুনি দেওয়া হয়। তবে পরিবারের দাবি, শামীম মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।
নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই দফায় শামীমকে মারধর করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। উপজেলার কুলিয়া এলাকায় প্রথম দফায় মারধরে আহত হলে পুলিশ তাকে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে সেখানেও তিনি আরেক দফা হামলার শিকার হন। অবস্থার অবনতি হলে মধ্যরাতে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে শামীমের বিরুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে মানুষ জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর কুলিয়া এলাকায় গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারের সামনে তিনিসহ বিক্ষুদ্ধ জনতা জড়ো হন। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা শামীমকে বের করে প্রথম দফায় গণপিটুনি দেয় বিক্ষুব্ধরা।
ঘটনার বিষয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ‘‘রাসুল ও আমাদের ইসলাম ধর্ম নিয়ে শামীম দীর্ঘ ৬ মাস ধরে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিলেন। প্রতিবেশী বা অন্য কেউ তার সঙ্গে কথা বললে তিনি ইসলাম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলতেন। আজ তৌহিদী জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছেন।’’
নিহতের ছোট ভাই সাগর হোসেন জানান, তারা পাঁচ ভাই। শামীম চতুর্থ। তিনি মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। তার দুটো সন্তান রয়েছে। পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তিনি অস্বাভাবিক আচরণও করতেন।
তিনি বলেন, ‘‘তবে শামীম যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে আইনের মাধ্যমে বিচার হতে পারত। কিন্তু একটা মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো কেন? আমরা তার জন্য কিছু করতে পারিনি। আমরা সামনে যেতে পারিনি। গেলে আমাদেরও মারপিট করা হতো।’’
সাগর হোসেন বলেন, ‘‘দুই দিন আগে শামীমের সঙ্গে তার স্ত্রীর ঝগড়া হয়। সেই সময় স্ত্রীর সঙ্গে কী বলেছেন, সেই সময়ে আশপাশের কেউ রেকর্ড করে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর বিষপান করে আত্নহত্যা করতে চেয়েছিলেন শামীম। এরপর কুলিয়ার গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে গিয়ে প্রথমে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এরপর হাসপাতাল ঘেরাও করে সেখানেও গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে আমার ভাইকে।’’
দেবহাটা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন জানান, ৯৯৯ এ ফোন পেয়ে সন্ধ্যার আগে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাত ৯টার দিকে কয়েকশত বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আবারও গণপিটুনি দেয়। এরপর পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌছায়, ততক্ষণে বিক্ষোভকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি আরো জানান, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
