কর্মক্ষেত্রে নারীরা কীভাবে নেতৃত্বে আসবেন, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাবেন এবং আরও সহায়ক পরিবেশে কাজ করবেন, তা নিয়ে আমরা নিয়মিত কথা বলছি। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে নারীদের ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনায় তাদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বাদ পড়লে সেই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
একজন নারী শারীরিক বা মানসিকভাবে ভালো না থাকলে কাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্ব সামলে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমি বিশ্বাস করি, কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সুস্থতা কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়, বরং এর অন্যতম ভিত্তি। ‘ব্রেস্ট ক্যানসার’ এ বিষয়টি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রতিবছর অক্টোবর মাসে গোলাপি রং হয়ে ওঠে ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ভালোবাসা, সমর্থন ও সংহতি প্রকাশের প্রতীক।
এ উপলক্ষে অনেক প্রতিষ্ঠানও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনাও কমে আসে। অথচ সমস্যাটি সারা বছরই রয়ে যায়। গ্লোবোক্যান ২০২২-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসার হলো ব্রেস্ট ক্যানসার। বছরে প্রায় ১৩ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হন। এই পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, সম্ভাব্য লক্ষণগুলো সময়মতো চিনতে পারা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
তবে সচেতনতা তৈরি করলেই একজন নারী চিকিৎসকের কাছে যাবেন, এমন নয়। আমাদের সমাজে নারীদের স্বাস্থ্য, বিশেষ করে ব্রেস্ট হেলথ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এখনও কঠিন। লজ্জা, ভয় কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক নারী শরীরে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলেও তা উপেক্ষা করেন। কখনো পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেও দেরি করেন। এতে সময়মতো রোগ শনাক্ত হওয়ার সুযোগ ব্যাহত হতে পারে। আমরা প্রায়ই নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখি, এবং তা ঠিকও। তবে একজন নারী নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারবেন, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার চারপাশের পরিবেশের ওপর। কখনো সামান্য দ্বিধাই সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই কর্মক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর অর্থ অফিসকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করা নয়। বরং এমন একটি কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারবেন, নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত হবেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য নমনীয় কর্মব্যবস্থা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এগুলো কেবল কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয় নয়। কর্মীরা যখন অনুভব করেন যে তাদের প্রতিষ্ঠান কাজের ফলাফলের পাশাপাশি তাদের সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেয়, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা, সম্পৃক্ততা ও আপনত্ববোধ আরও দৃঢ় হতে পারে।
দারাজ বাংলাদেশে নারীদের পেশাগত উন্নয়ন এবং নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ কর্মপরিবেশ তৈরির ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালে আমরা ডিউইমেন উদ্যোগটি শুরু করি। সময়ের সঙ্গে এ উদ্যোগের আওতায় নারীদের অবদানের স্বীকৃতি, মেন্টরশিপ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, নমনীয় কর্মব্যবস্থা এবং সহকর্মীদের মধ্যে সংযোগ তৈরির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এ বছর অক্টোবর মাসে দারাজের নারী ও পুরুষ সহকর্মীরা একসঙ্গে পিঙ্ক ডে পালন করেছেন। কারণ, ব্রেস্ট ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির দায়িত্ব শুধু নারীদের নয়। পুরুষ সহকর্মীরাও যখন এ আলোচনায় অংশ নেন, তখন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলা সহজ হয় এবং দীর্ঘদিনের সংকোচ কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। তবে আমরা চাইনি, পিঙ্ক ডে শুধু গোলাপি পোশাক পরার একটি আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকুক। তাই আমরা একটি সচেতনতামূলক সেশনেরও আয়োজন করছি, যেখানে একজন চিকিৎসক ব্রেস্ট ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ, সতর্ক থাকার উপায়, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব এবং ব্রেস্ট সেলফ-এক্সামিনেশন নিয়ে আলোচনা করবেন। সহকর্মীরা সরাসরি প্রশ্ন করারও সুযোগ পাবেন।
আমরা আশা করি, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শুরু হওয়া আলোচনা কর্মক্ষেত্রের গণ্ডি পেরিয়ে পরিবার ও সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে এবং আরও মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছাবে। এ ধরনের উদ্যোগ একা পুরো সমস্যার সমাধান করতে না পারলেও সচেতনতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নিয়োগদাতাদের ভূমিকা তুলে ধরে। ব্রেস্ট ক্যানসারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সম্ভব নয়।
এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, চিকিৎসাসেবার সুযোগ, পরিবারের সহযোগিতা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ। তবে কর্মক্ষেত্রগুলো নিজেদের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্তত এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে কোনো নারী নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে ভয় বা সংকোচ বোধ করবেন না। এই প্রচেষ্টা শুধু আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতা মাস কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নারীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার হতে হবে বছরের ৩৬৫ দিনের।
আমরা যদি সত্যিই চাই নারীরা নেতৃত্বে আসুন এবং আগামী দিনের করপোরেট জগতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন, তাহলে তাদের সুস্থতাকেও তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পেশাগত লক্ষ্যের সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের পাশে থাকা মানে শুধু তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা নয়। বরং এমন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিজের যত্ন নিতে পারবেন, প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাবেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবেন। ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতা মাস আমাদের এই দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যাবে অক্টোবর শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের সুস্থতার জন্য কী করছে, তার মধ্য দিয়ে।
বিজ্ঞপ্তি/
