সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ, আঙিনা, জলাশয় ও পতিত জমিতে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর পথ খুলে দিতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে অধ্যাদেশের সাত নম্বর ধারায় এ সংক্রান্ত কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। এতে কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে এ সংক্রান্ত কেনাকাটায় ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার ‘আবশ্যক হবে না’ বলেও তুলে ধরা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এ ভিন্ন যাই থাকুক, এই অধ্যাদেশের 'উদ্দেশ্য পূরণে' এ বিধান প্রযোজ্য হবে বলা হয় অধ্যাদেশে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ১৯ অক্টোবর অধ্যাদেশটিতে সই করেন। একইদিন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এটি প্রকাশ করলেও রোববার জ্বালানি মন্ত্রণালয় এটি সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়েছে।
অধ্যাদেশ জারির দিন থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
অধ্যাদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়, বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন কার্যক্রমের দ্রুত বিস্তার নিশ্চিত করতে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সংসদ অধিবেশনে না থাকায় এবং আশু ব্যবস্থা নেওয়ার মত পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকায় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এটি জারি করেছেন।
কোন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ‘বিশেষ’
অধ্যাদেশে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার’ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি কোম্পানির পাশাপাশি বাসাবাড়ির ভবনের ছাদ, আঙিনা বা উপযুক্ত স্থানে বসানো সৌরবিদ্যুৎ এর আওতায় পড়বে।
এসব ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সক্ষমতা হবে ৫ মেগাওয়াট। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (ল্যান্ডবেজড সোলার) এই সংজ্ঞার বাইরে থাকবে।
‘উপযুক্ত স্থান’ বলতে ভবনের ছাদ বা আঙিনা, ভবন সংলগ্ন পতিত জমি বা জলাশয়কে বোঝানো হয়েছে। ‘ছাদ’-এর সংজ্ঞায় আছে বাসাবাড়ি, পার্কিংলট, গ্যারেজ, বাণিজ্যিক বা শিল্প স্থাপনার ছাদ, টিনশেড এবং গ্রাহকের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় থাকা খালি জায়গা বা সীমানা প্রাচীর।
শর্ত হল, সেখানে বিতরণ ইউটিলিটির মিটার থাকতে হবে, অথবা বিতরণ ইউটিলিটি নেট-মিটারিং পদ্ধতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে এমন সুবিধাজনক এলাকা হতে হবে।
ওপেক্স অগ্রাধিকার, ক্যাপেক্সেরও সুযোগ
অধ্যাদেশে দুটি বিনিয়োগ মডেলের কথা বলা হয়েছে। এর একটি ওপেক্স ও অন্যটি ক্যাপেক্স।
ওপেক্স মডেলে সার্ভিস প্রোভাইডার নিজ খরচে উপযুক্ত স্থানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসান, চালান ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। উৎপাদিত বিদ্যুতের অংশ বা মূল্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পারস্পরিক সমন্বয় করা হয় হয় এই মডেলে।
অন্যদিকে ক্যাপেক্স মডেলে প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেনে, স্থাপন করে এবং মালিকানা সংরক্ষণ করে।
আইন অনুযায়ী, বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওপেক্স মডেলে স্থাপন করা যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল বা নিয়মিত আয় আছে, তারা ভবিষ্যৎ আর্থিক সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে ক্যাপেক্স মডেলে ব্যবস্থা বসাতে পারবে। বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা বা কোম্পানি অথবা সরকার ঘোষিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে কাজ করবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই কর্তৃপক্ষ প্রচলিত তালিকাভুক্তি পদ্ধতি সহজ করে ওপেক্স ও ক্যাপেক্স মডেলে বিনিয়োগের জন্য জেলাভিত্তিক নির্দিষ্ট সংখ্যক যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডারের তালিকা তৈরি, হালনাগাদ ও সংরক্ষণ করবে।
প্রক্রিয়াটি হবে এ রকম- নির্ধারিত নিবন্ধন ফি দিলে যোগ্য প্রতিষ্ঠান সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে তালিকাভুক্ত হবে। তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে গ্রাহক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের সার্ভিস প্রোভাইডার বেছে নেবেন।
প্রস্তাব আহ্বান, প্রস্তাব শিট এবং মূল্যায়ন ও নির্বাচনের মানদণ্ড সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঠিক করবে এবং কোনো গ্রাহক চাইলে সার্ভিস প্রোভাইডার ছাড়াই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাছাই করা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসাতে পারবেন।
প্রতিটি প্রকল্পে গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হবে। আদর্শ চুক্তিনমুনা ও শর্তাবলি সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে ঠিক করবে।
অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে চুক্তিতে যা থাকতে হবে
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর জন্য উপযুক্ত স্থান ব্যবহারে গ্রাহকের অধিকার, ব্যবহারের শর্ত এবং স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ, যন্ত্রপাতি ও উপকরণের গুণগত মান, কারিগরি মানদণ্ড ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত, স্থাপন, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের ফলে সৃষ্ট ই-বর্জ্যের নিরাপদ সংগ্রহ, পরিবহন, পুনর্ব্যবহার ও অপসারণ ইত্যাদি।
অধ্যাদেশে নেট-মিটারিংকে ‘দ্বিমুখী বিদ্যুৎ পরিমাপ ও বিলিং ব্যবস্থা’ বলা হয়েছে। এর আওতায় গ্রাহক নিজের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করে উদ্বৃত্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন।
গ্রিডে দেওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ নির্ধারিত বিলিং মেয়াদে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের পরও উদ্বৃত্ত থাকলে প্রযোজ্য বিধান ও সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য গ্রাহক পাবেন।
নেট-মিটারিং জনপ্রিয় করতে সরকার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রণোদনামূলক কার্যক্রম ঘোষণা ও জারি করতে পারবে বলা হয়েছে অধ্যাদেশে। তবে প্রণোদনার ধরন বা পরিমাণ বলা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল
কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নে নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে অধ্যাদেশে ‘জাতীয় পলিসি কাউন্সিল’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এর সভাপতি প্রধানমন্ত্রী।
কাউন্সিল বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ ও জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সার্বিক নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় করা এবং নেট-মিটারিং, প্রণোদনা প্যাকেজ, ট্যারিফ কাঠামো এবং বিনিয়োগ মডেল (ওপেক্স ও ক্যাপেক্স) বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি করবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ওয়েবসাইটে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সব তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং ব্যবস্থাগুলো সচল আছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে বলা হয়েছে অধ্যাদেশে।
অধ্যাদেশে কয়েকটি নতুন অপরাধ এবং দণ্ডও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে বলে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
চোরাই জেনেও যন্ত্রাংশ কেনা, বিক্রি বা হেফাজতে রাখার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে একই বিধান।
এই অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনা দিলে এবং তার ফলে অপরাধ সংঘটিত হলে মূল অপরাধীর মতই দণ্ড হবে বলে তুলে ধরা হয় অধ্যাদেশে।
এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাই থাকুক, এই অধ্যাদেশের অধীন অপরাধ বিচার করবেন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে এসব অপরাধ ভ্রাম্যমাণ আদালতেও বিচার করা যাবে।
অধ্যাদেশে কোনো মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা, শুল্ক-কর সুবিধা, ট্যারিফের হার বা প্রণোদনার অঙ্ক উল্লেখ নেই। এসব বিষয় প্রজ্ঞাপন, আদর্শ চুক্তিনমুনা, বিধি ও কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ওপর ছাড়া হয়েছে।
