কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র হয়ে উঠেছে। শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী গ্রামে গত এক সপ্তাহে নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে অন্তত ১৭ পরিবারের ভিটেমাটি। বসতবাড়ির পাশাপাশি নদীগর্ভে চলে গেছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি।
ভাঙন এতটাই তীব্ররুপ ধারণ করেছে যে, জমির কাঁচা-পাকা ধান কাটতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত মাত্র এক বছরেই এই এলাকায় প্রায় সাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে ছয়/সাত মাস আগে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেললেও সঠিক তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলোও এখন নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সুখেরবাতি এলাকার ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, গত এক সপ্তাহে তার ওয়ার্ডে ৭টি এবং পার্শ্ববর্তী ৮নং ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে সুখেরবাতি এলাকার বাসিন্দা মৃত জুরান শেখের ছেলে দেলোয়ার, মৃত নওশাদের ছেলে নজরুল ইসলাম, বাবু পাগলার ছেলে রুপচান, আশেক আলীর মেয়ে আয়শা খাতুন, মৃত বুলু শেখের ছেলে ছোবহান এবং গোলাপ ঠাকুরের ছেলে লালু শেখের বাড়ি রয়েছে।
অন্যদিকে, ৮নং ওয়ার্ডে ঘরবাড়ি হারানো বাসিন্দারা হলেন- মৃত বুলা বয়াতির ছেলে কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, ফাতেম, কদম আলী, কোরবান আলীর ছেলে আব্দুল খালেক, পিয়ার আলীর ছেলে মহর উদ্দিন, আব্দুস ছপুরের ছেলে সিরাজুল, মৃত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলী এবং সোলায়মানের ছেলে আক্কাস আলী।
এছাড়া চরে নতুন বাড়ি করা আরো দুই ব্যক্তির বসতভিটাও নদীগর্ভে চলে গেছে, যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নদীভাঙনে বসতবাড়ির পাশাপাশি ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুখেরবাতি চরে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে কৃষকদের নিরুপায় হয়ে কাঁচা ধান কাটার কিছু ছবি ভাইরাল হয়।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, ওই এলাকার মৃত মহেজ মোল্লার ছেলে ইউনুছ মোল্লার নদীর তীরবর্তী দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এছাড়া মৃত ওসমান প্রামাণিকের ছেলে ছবুর প্রামাণিকের ৪ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা আমন ক্ষেত নদীতে চলে গেছে। একই সঙ্গে ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলীর বাড়িসহ ৩ বিঘা ধানি জমিও নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে।
হঠাৎ করে ভাঙন তীব্র হওয়ায় চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নিঃস্ব পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে ও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্রুত ও স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা জমসের আলী অভিযোগ করে বলেন, “আমার তিন বিঘা জমিসহ বসতভিটা চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। তবুও পানি উন্নযন বোর্ড কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
রৌমারীর চর শৌলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান জানান, সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর ওয়ার্ড তিনটিতে নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এখানে ব্লকের কাজ না করায় জিও ব্যাগ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যেসব জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, সেগুলো স্রোতে নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে নদীর পাড়। ফলে দ্রুত ফসলি জমি, গাছপালা ও বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। আগে সরকারিভাবে ভাঙনকবলিতদের আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা হলেও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অসহায় গরীব মানুষের জন্য নতুন করে মাথা গোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বরাদ্দ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।
