রিয়াদে হামলায় সৌদি আরবে জরুরি সতর্কতা, হুথিদের নতুন কৌশল ‘এপস্টেইন’
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এই ঘটনায় রিয়াদসহ তিনটি এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। এর মধ্যেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রচারের নতুন কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি ব্যবহার করছে হুথিরা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও সতর্কতা জারির এই তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথিকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে হুথিরা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, হুথিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করার পর দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটিকে প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে। এর আগে সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদ, নাজরান ও ওয়াদি আল-দাওয়াসির এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব এলাকায় তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি কোথাও ভিড় না করতে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরে নতুন প্রচারকৌশল ‘এপস্টেইন’
সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে জনমত প্রভাবিত করতে নতুন প্রচারকৌশল নিয়েছে হুথিরা। এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি। বিশেষ করে পবিত্র কাবার গিলাফের আদলে তৈরি কাপড় এপস্টেইনকে উপহার দেওয়ার তথ্যকে সামনে এনে সৌদি আরবের সমালোচনা করছে গোষ্ঠীটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথিকে কেন্দ্র করে বিবৃতি, ভিডিও, গান, বক্তৃতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে হুথিরা। এসব নথিতে সৌদি রাজদরবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এপস্টেইনকে কাবার গিলাফের মতো দেখতে কাপড় উপহার দেওয়ার তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, যারা এপস্টেইনকে কাবার গিলাফ দিয়েছিল, তারাই মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে সৌদি কর্মকর্তারা এই অভিযোগ কিংবা কাপড় উপহার দেওয়ার প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
প্রচারের কেন্দ্রে পবিত্র মক্কা
হুথিদের সাম্প্রতিক প্রচারে পবিত্র মক্কা ও কাবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের ইসলামের রক্ষক এবং বিদেশি প্রভাবের বিরোধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। মুসলিমদের পবিত্রতম স্থান কাবা মক্কায় অবস্থিত হওয়ায় এ স্থানকে ঘিরে যেকোনো অভিযোগ ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। গত মাসে সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল, হুথিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। তবে হুথিরা এ অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। ইয়েমেনের কৌতুক অভিনেতা মুস্তাফা আল-মোমারি এই বিষয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তার অনুসারীর সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। এ ছাড়া ইয়েমেনের একজন ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পীও অভিযোগটি নিয়ে গান লিখেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মুস্তাফা আল-মোমারি হুথি ও সৌদি আরব নিয়ে তার অবস্থানে পরিবর্তন এনেছেন। তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানেরও সমালোচনা করেছেন।
হুথি নেতার বক্তব্যেও এপস্টেইন
হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির বিভিন্ন বক্তৃতায়ও এপস্টেইনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথির গুরুত্ব তুলে ধরে দাবি করেন, এসব নথিতে এমন একটি নেটওয়ার্কের তথ্য রয়েছে, যা নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তৈরি করে। এপস্টেইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে মারা যান। কর্মকর্তারা তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে জানিয়েছিলেন। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়ে প্রকাশিত নথিগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করা ডানপন্থি জনপ্রিয় পডকাস্টার জেক শিল্ডস হুথিদের দৃঢ়তার প্রশংসা করে তাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। তবে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকে হুথিদের প্রচারের সামগ্রিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি প্রচারযুদ্ধ
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে আসছে। অন্যদিকে, দেশটির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে হুথিরা। দীর্ঘদিনের এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি।
রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা এবং এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে প্রচার দুই ঘটনাই সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার উত্তেজনার ভিন্ন দুটি দিক তুলে ধরছে। একদিকে রয়েছে সামরিক হুমকি ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার তৎপরতা, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের চেষ্টা।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বক্তব্য এবং এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে হুথিদের অভিযোগকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
