নিজস্ব প্রতিবেদক · ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১:০১ অপরাহ্ন
আগাম লাউ বিক্রি করে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করেছেন সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নান। এখন তার আশা, জমিতে চাষ করা শিম, লালশাক, মূলাশাক ও পালংশাক থেকেও ভালো আয় হবে।
শীত মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সবজি বাজারে তুলতে পারলে বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ থাকে। তাই হাওরের পানি নেমে যাওয়ার পর আগাম সবজি উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছেন তিনি। তার মতো জেলার অনেক কৃষকই এখন সবজি চাষে ব্যস্ত।
চলতি বছর সুনামগঞ্জে ১২ হাজার ৭৭১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।
গত বছরের তুলনায় এবার ১১ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলার উঁচু এলাকাগুলোতে এ ধরনের চাষ বেশি হয়।
সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর, সুরমা ও রঙ্গারচর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে সবজি আবাদ শুরু করেছেন কৃষকেরা।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নান এবার ১৫ শতক জমিতে শিম ও লাউ লাগিয়েছেন। এর মধ্যে আগাম জাতের লাউ বিক্রি করে ১০ হাজার টাকার বেশি পেয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া দুই বিঘা জমিতে লালশাক, মূলাশাক ও পালংশাক চাষ করেছেন। এসব সবজি বাজারে বিক্রি করে ভালো আয় হবে বলে প্রত্যাশা তার।
কৃষকদের কাছে আগাম সবজি চাষের প্রধান আকর্ষণ মৌসুমের শুরুতে বেশি দাম পাওয়ার সম্ভাবনা। তখন বাজারে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকে। তবে এ সময়ে উৎপাদন ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। অসময়ের বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমলে গাছের গোড়া পচে যেতে পারে। ছত্রাকসহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ফসল। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলন না হলে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, আগাম সবজি চাষের ক্ষেত্রে জমির ধরন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। উচু জমিতে চাষের পাশাপাশি জমিতে উঁচু বেড তৈরি এবং পানি বের হওয়ার জন্য নালা রাখতে হবে।
এতে বৃষ্টির পানি জমে থাকার ঝুঁকি কমবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করলে সম্ভাব্য বৃষ্টির বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াও সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
শাহাদাৎ আরও বলেন, সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাতের কারণে সবজিখেতে ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি রয়েছে। তাই নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো গাছে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পোকামাকড় দমনে অপ্রয়োজনে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে, সবজির পরিচর্যায় সুষম সার ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে জৈব ও কম্পোস্ট সারের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রোগ ও পোকাভেদে দমনপদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া বালাইনাশক ব্যবহার না করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
জেলার সদর উপজেলার জিনারপুর গ্রামের কৃষাণী সালেহা বেগমও বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। তার আবাদে রয়েছে লালশাক, মূলাশাক, আগাম জাতের টমেটো ও বেগুন। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে চাষাবাদ করছেন তিনি। এতে পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন বাজারে বিক্রি করে আয় করতে পারছেন।
সুনামগঞ্জে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ শুরু হয়। এ সময় লাউ, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, টমেটো, লালশাক, মূলাশাক, পালংশাক ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। এসব ফসলের উৎপাদন ভালো রাখতে নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ, আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। বীজ নির্বাচন, সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে সহায়তা নেওয়া যাবে। বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাত্রা ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার পাশাপাশি সবজি সংগ্রহের আগে মোড়কে উল্লেখ করা অপেক্ষার সময়ও অনুসরণ করতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে সুনামগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়তে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে অন্য এলাকাতেও সবজি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
