পুরুষ পূর্বসূরিদের তুলনায় নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত সময় গৃহস্থালি কাজ ও মেকআপে ব্যয় করতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। তার এ মন্তব্যের পর দেশজুড়ে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা, সময় ব্যবস্থাপনা ও তার কর্মদক্ষতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) জাপানের পার্লামেন্ট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে গিয়ে পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে হয়।
পার্লামেন্টে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সকালে উঠে আমি গোসল করি, নাশতা (প্রাতরাশ) তৈরি করি এবং থালাবাসন ধুই; এরপর মেকআপ নিই। এসব কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়, পুরুষ প্রধানমন্ত্রীদের চেয়ে আমাকে প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। ক্যামেরার সামনে উপস্থিত হওয়ার আগে তার মেকআপ ও নিজেকে প্রস্তুত করতে যে বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয়, তা অনুধাবন করতে তার সহকারী ও কর্মীদের বেশ কিছু সময় লেগেছে বলেও তিনি জানান।
তবে মেকআপ, গোসল ও গৃহস্থালি কাজের ওপর প্রধানমন্ত্রীর এই অতিরিক্ত জোর দেওয়াকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি জাপানের সচেতন মহল। দেশের মানুষের বড় একটি অংশের মতে, তার এই বক্তব্য জাপানে দীর্ঘদিন ধরে চলা সেকেলে লিঙ্গভিত্তিক ধ্যানধারণা এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ক্ষতিকর সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।
জাপানে সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা অত্যন্ত কঠোর। পুরুষদের জন্য দীর্ঘ সময় কর্মক্ষেত্রে থাকা স্বাভাবিক ঘটনা হলেও চাকরিজীবী নারীদের ওপর গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে গড়ে একজন পুরুষ যেখানে প্রতিদিন মাত্র ৪০ মিনিট গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, সেখানে একজন নারী প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজে সময় দেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। তাদের মতে, সন্তান লালন-পালন কিংবা বয়স্ক পিতা-মাতার দেখাশোনা করা সাধারণ কর্মজীবী নারীদের তাকাইচির চেয়েও অনেক বেশি কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তার ব্যক্তিগত ‘সময় ব্যবস্থাপনা’ (টাইম ম্যানেজমেন্ট) এর দুর্বলতা এবং নারী সমতা বিষয়ে সেকেলে ভাবনারই প্রকাশ।
ফুসাকো মিওয়া নামে এক নারী আইনজীবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারলে পুরুষদের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেশি সময় লাগলেও তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু মেকআপের জন্য সময় লাগে— এমন বাহানা দেখিয়ে ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা করা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর গৃহস্থালির চাপ ও সরকারি কাজের জন্য রাতে মাত্র শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর কথা জানিয়েছিলেন তাকাইচি। তার এই বক্তব্যকেও কাজের সুস্থ পরিবেশের জন্য নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে সমালোচনা করা হয়।
অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যম এক্সে নিয়মিত পোস্ট করলেও সম্প্রতি পার্লামেন্টে উপস্থিতি এবং নীতি নির্ধারণী আলোচনায় তাকাইচির উপস্থিতি কমে গেছে। সপ্তাহান্ত ও রাতের বেলা তিনি নিজেকে সরকারি বাসভবনেই সীমাবদ্ধ রাখছেন, যা নীতিগত আলোচনা এড়ানোর প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত বুধবার একাধিক কেলেঙ্কারির দায়ে তাকাইচি সরকারের নবনিযুক্ত কৃষিমন্ত্রী কাজুও ইয়ানা পদত্যাগ করায় রাজনৈতিক ধাক্কায় পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ইয়ানার বিরুদ্ধে নির্বাচনি প্রচারণায় তাকে সমর্থন না দেওয়া, পৌরসভার সড়ক বাজেট ছাঁটাইয়ের হুমকি এবং সমর্থকদের বেআইনি পরিবহণ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এই সময় ব্যবস্থাপনা ইস্যুতে জোট শরিক ‘জাপান ইনোভেশন পার্টির’ শীর্ষ নেতা ফুমিতাকে ফুজিটা পার্লামেন্টের দৈনিক দীর্ঘ অধিবেশনের সময় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এনএক্সজেআই রিসার্চের’ বরাতে ফুজিটা জানান, ২০২২ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে যেখানে ৭২ দিন পার্লামেন্ট অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল, সেখানে ব্রিটেনে মাত্র ৫০ দিন এবং জার্মানিতে মাত্র ১৩ দিন উপস্থিত থাকতে হয়েছিল। তাদের প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রয়োজনীয় বাবুর্চি ও গৃহস্থালি কর্মী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বে মননিবেশ করতে পারেন এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পান।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি স্বীকার করেন, তার ব্যস্ত সময়সূচি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিতভাবে রাতের বেলা তাকে নথিপত্রের বিশাল ফাইল বাসায় নিয়ে যেতে হয়। তাকাইচি বলেন, গভীর রাতে ফাইলগুলো পড়তে আমার ভালোই লাগে। তবে সত্যি বলতে, শান্ত হয়ে বসে জাপানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে ভাবা কিংবা একটি বড় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা রূপরেখা তৈরি করার মতো সময় বের করা আমার জন্য সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: জাপান
১০ অক্টোবর ২০২৬
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
