১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান নৌমন্ত্রীর
দেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না। এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর কুড়িলে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) তিন দিনব্যাপী ‘অষ্টম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন অ্যান্ড অফশোর এক্সপো—বিমক্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, সমুদ্র, নদী ও জলরাশির প্রাচুর্যের কারণে বাংলাদেশ সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ সম্ভাবনাময় একটি দেশ। প্রাকৃতিকভাবে প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও এর সম্ভাবনার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকার এ খাতের প্রতিটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়।
বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটিকে বাংলাদেশে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লালদিয়া ও পানগাঁওসহ বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনালের কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে। সম্প্রতি ডিপি ওয়ার্ল্ডকেও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব
সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, সমুদ্রের সম্পদ কাজে লাগাতে গিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না। সমুদ্রের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করে নিয়ন্ত্রিত ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অল্প সময়ের মধ্যেই এসব সম্পদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশে জ্বালানি, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহারসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অগ্রসর হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সামুদ্রিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ খাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দক্ষ জনশক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর
সামুদ্রিক খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এ খাতের কর্মীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে সরকার আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারিগরি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে চায় সরকার। এ খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে এগিয়ে আসতে চায়, সরকার সেভাবেই সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ফসিল জ্বালানি থেকে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তর অনেক সময় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তাই পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
সেভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে সামুদ্রিক ও অফশোর শিল্পের আধুনিক প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে। এতে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বৈঠক, সেমিনার ও প্যানেল আলোচনার আয়োজন রয়েছে।
সামুদ্রিক পরিবহন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনর্ব্যবহার, বন্দর পরিচালনা ও অফশোর কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে এ প্রদর্শনী।
