দিনের আলোয় হয়তো গাছটি চেনার উপায় থাকে না। তবে সন্ধ্যা নামলেই বাতাসে ভেসে আসে মিষ্টি এক ঘ্রাণ। রাত যত গভীর হয়, সেই সুবাস ততই তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় এখন ছাতিম ফুলের এমনই মনমাতানো ঘ্রাণ মুগ্ধ করছে নানা বয়সী মানুষকে।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছাতিমগাছে এখন ফুটেছে হালকা ঘিয়ে-সাদা ফুল। দিনের বেলায় গাছজুড়ে থোকায় থোকায় ফুল দেখা গেলেও আসল রূপটি খোলে সন্ধ্যার পর। তবে স্থানীয়দের আক্ষেপ, একসময় গ্রামগঞ্জে প্রচুর দেখা গেলেও এখন প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ছাতিমগাছ।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, মাদকতাময় তীব্র ঘ্রাণ ছড়ানো ছাতিম গাছের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালস্টোনিয়া স্কলারিস। অ্যাপোসাইনেসি পরিবারের এই চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী বৃক্ষের সংস্কৃত নাম সপ্তপর্ণী। গাছটির প্রতিটি ডালে সাতটি পাতা চক্রাকারে সাজানো থাকে, যার মাঝখানে ফোটে ফুল। পরিণত ছাতিমগাছ উচ্চতায় ২০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর কাঠ ব্লকবোর্ড ও পেনসিল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি গাছটির ছাল ও অন্যান্য অংশ ঐতিহ্যগত ভেষজ চিকিৎসায় কাজে লাগান চিকিৎসকেরা। এই গাছের আদি নিবাস ভারতে।
সাধারণত হেমন্তের ফুল হিসেবে পরিচিত হলেও শরতের শেষ দিক থেকেই ফুটতে শুরু করে ছাতিম। দিন শেষে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এর সুবাস ছড়াতে শুরু করে। রাত যতই বাড়তে থাকে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে তার তীব্রতা।
সাহেবাবাদ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মারিয়াম বলেন, ছাতিম তীব্র ঘ্রাণযুক্ত ফুল। দূর থেকেই এর ঘ্রাণ ভেসে আসে। বিশেষ করে রাত গভীরে এর ঘ্রাণ বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। আমাদের উপজেলার কিছু কিছু জায়গায় ছাতিম গাছ দেখা যায়। আমাদের কলেজ আঙিনাতেও একটি ছাতিম গাছ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ফুলপ্রেমী আশরাফুল ইসলাম জানান, তার পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকা ফুলগুলোর মধ্যে ছাতিম একটি। দেখতে সুন্দর এমন কারণে নয়, এর মোহনীয় সুবাসের জন্যই এটি তার পছন্দের শীর্ষে। প্রতিবছরই তিনি এই ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকেন। রাতবিরেতে এই ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসলে মন জুড়িয়ে যায়। তবে এলাকার এই গাছগুলো দিন দিন কমে যাওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, এ সময়টায় প্রকৃতিতে ছাতিম ফুল ফুটেছে। সন্ধ্যা হলেই এ ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। এই মিষ্টি ঘ্রাণ মন জুড়িয়ে দেয়। শত ব্যস্ততার মধ্যেও ছাতিম ফুলের সুবাস মানুষকে প্রকৃতির কাছে টানে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ছাতিম ফুলের সৌন্দর্য ও ঘ্রাণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রয়েছে। এর ফুলে মৌমাছিসহ বিভিন্ন পরাগবাহী কীটপতঙ্গের আনাগোনা দেখা যায়। তাই পুরোনো গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি উপযুক্ত স্থানে নতুন ছাতিমগাছ লাগানো প্রয়োজন। তা না হলে হেমন্তের পরিচিত এই সুবাস একসময় প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউনানি মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ছাতিম ফুলের সুবাস আর সব ফুলের ঘ্রাণ থেকে আলাদা। তবে দিনের বেলায় এ ফুলের ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। সন্ধ্যা নামার পর চারপাশে এর ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, গাছটির বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যগত ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কোনো রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
