রংপুর: রংপুরের পীরগাছায় কৃষি সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডের তালিকায় থাকা ব্যক্তিরাই চূড়ান্তভাবে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে এক কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটি থেকে প্রকাশিত তালিকায় পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে নয়জনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক কর্তৃক সুপারিশকৃত গত ২২ সেপ্টেম্বরের স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত আবেদনকারীদের অস্থায়ী ভিত্তিতে শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামে একটি তালিকা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেলা প্রশাসক বরাবর সুপারিশকৃত তালিকা জমা দেন। চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দলীয় প্যাডের তালিকায় থাকা প্রায় সবাই মনোনয়ন পেয়েছেন।
তালিকায় যারা রয়েছেন
কল্যাণী ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন জিকরুল আমিনের প্রতিষ্ঠান বেলী ফার্টিলাইজার। তিনি কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। আর পারুল ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মো. আব্দুল মতিন সরকারের মেসার্স নুহা ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ইটাকুমারী ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মো. আলিমুদ্দিনের মেহজাবিন ট্রেডার্স। তার ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। অন্নদানগর ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন জয়িতা আক্তার জিনির জয়িতা সার বিতান। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে।
ছাওলা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন জাকির হোসেনের মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ। তাম্বুলপুর ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন সুইটি বেগমের মেসার্স সামান্তা অ্যান্ড সিফা ট্রেডার্স। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিসের স্ত্রী।

বিএনপির দলীয় প্যাডে ডিলারদের নাম।
পীরগাছা সদর ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মোছা. সুলতানা ফেরদৌসীর রিয়া এন্টারপ্রাইজ। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী। কৈকুড়ি ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মীর তৌফিক হাসানের মীর তৌফিক ট্রেডার্স। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে।
কান্দি ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছে মেসার্স সান ট্রেডার্স। এটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের প্রতিষ্ঠান। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
অভিযোগের কেন্দ্রে দুই নেতা
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার নয় ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের যোগফল দাঁড়ায় এক কোটি ৩১ লাখ টাকা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিসের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে ওই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। কোথাও অর্থ লেনদেন, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান। তার অভিযোগের মধ্যে ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা টাকা গ্রহণের বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিস।
স্থানীয় বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, নয়টি ইউনিয়নে এত আবেদনকারীর মধ্যে একই উপজেলার শীর্ষ দুই নেতার স্ত্রী কীভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত হলেন। তাদের যোগ্যতা, আবেদনপত্র, গুদাম, ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে বিষয়টি নিয়ে জেলা বিএনপির মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলা বিএনপি নেতা বলেন, এ ধরনের স্বজনপ্রীতিমূলক নিয়োগ দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের তালিকায় পীরগাছা ছাড়াও রংপুর সদর উপজেলার চারজন, কাউনিয়া উপজেলার ছয়জন, তারাগঞ্জ উপজেলার তিনজন, বদরগঞ্জে নয়জন, মিঠাপুকুরে ১৪ জন, পীরগঞ্জে ১৬ জন, গঙ্গাচড়ায় নয়জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনে একজনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার তালিকাতেও একই ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
