ইন্দ্রজিৎ সাহু: কড়াইয়ে ফুটছে গরম তেল। তার মধ্যেই একের পর এক পড়ছে চপ, পেঁয়াজি আর পেঁয়াজ পকোড়া। ভাজাভুজির গন্ধে সকাল থেকেই দোকানের সামনে ভিড়। কেউ বাজার করতে এসে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ আবার পথ চলতে চলতেই থমকে যাচ্ছেন পরিচিত স্বাদের টানে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের দশগ্রাম খাজুরি বাজারে এ ছবি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় বসে তেলেভাজা বিক্রি করছেন মহিলা। নাম ঝর্ণা পাত্র। কিন্তু তাঁর হাতের সুস্বাদু চপ-পেঁয়াজির আড়ালে যে এত দীর্ঘ লড়াই, এত দুঃখ-কষ্ট আর আত্মত্যাগের ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। জীবন তাঁকে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কখনও অভাব, কখনও স্বামী হারানোর যন্ত্রণা, কখনও তিন মেয়েকে মানুষ করার দুশ্চিন্তা। কিন্তু কোনও প্রতিকূলতার সামনেই মাথা নত করেননি ঝর্ণা। প্রায় ৪৫ বছর ধরে তেলেভাজার দোকানকে আঁকড়ে ধরে সংসারের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন তিনি।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড় ব্লকের খুড়শি অঞ্চলের টাকলা গ্রামের বাসিন্দা ঝর্ণা পাত্র। বয়স এখন ষাটের দোরগোড়ায়। স্বামী অশোক পাত্রকে নিয়ে একসময় অভাবের সংসার ছিল তাঁর। তিন মেয়ের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়া, সংসারের নিত্যদিনের খরচ জোগাড় করা সব মিলিয়ে টানাটানির মধ্যেই কাটছিল দিন। সেই অভাব ঘোচাতেই প্রায় সাড়ে চার দশক আগে স্বামীর হাত ধরে দশগ্রামের খাজুরি বাজারে একটি ছোট্ট চালাঘরে তেলেভাজার ব্যবসা শুরু করেন ঝর্ণা। সম্বল বলতে ছিল সামান্য পুঁজি, একটি উনুন, কড়াই আর নিজেদের পরিশ্রম।
প্রথম কয়েক মাস ক্রেতার দেখা মিলত না বললেই চলে। দোকান খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন স্বামী-স্ত্রী। কোনও দিন সামান্য বিক্রি, কোনও দিন প্রায় কিছুই নয়। তবু আশা ছাড়েননি। ধীরে ধীরে ঝর্ণার হাতের চপ, পেঁয়াজি ও পাকোড়ার স্বাদ ছড়িয়ে পড়তে থাকে এলাকায়। বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। একসময় খাজুরি বাজারের পরিচিত নাম হয়ে ওঠে ঝর্ণার তেলেভাজার দোকান। সংসারেও একটু একটু করে স্বস্তি ফিরছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

প্রায় ২৩ বছর আগে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় স্বামী অশোক পাত্রের। মুহূর্তে যেন মাথার উপর থেকে সরে যায় ভরসার ছাদ। তিন ছোট মেয়েকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েন ঝর্ণা। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব। মেয়েদের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া, ভবিষ্যৎ সবকিছুর ভার এসে পড়ে তাঁর একার কাঁধে। কিন্তু চোখের জল মুছে আবারও ঘুরে দাঁড়ান তিনি।
সকাল হলেই দোকানের ঝাঁপ খোলা, উনুন ধরানো, চপ-পেঁয়াজি তৈরি করা, ক্রেতাদের সামলানো। তারপর বাড়ি ফিরে তিন মেয়ের দেখাশোনা। দিনের পরদিন, বছরের পর বছর এভাবেই চলেছে তাঁর সংগ্রাম। নিজের ক্লান্তি কিংবা কষ্টকে গুরুত্ব না দিয়ে মেয়েদের মানুষ করার স্বপ্নকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন ঝর্ণা। সেই পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত বিফলে যায়নি। অভাব-অনটনের মধ্যেও তিন মেয়েকে বড় করেছেন। একে একে তিন মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রায় ২২ বছর ধরে একার লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছেন দোকান। তবে ঝর্ণার জীবনের সবচেয়ে মানবিক অধ্যায়টি লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক ঘটনায়।
নিজের তিন মেয়েকে মানুষ করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়েছে, সেখানে আরও একটি শিশুর দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। একসময় দশগ্রাম বাজারে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক ছোট্ট ছেলেকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন ঝর্ণা। রক্তের সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু মায়া-মমতার কোনও অভাব রাখেননি। নিজের সন্তানদের সঙ্গে তাকেও যত্নে বড় করেছেন। শুধু বড় করাই নয়, পরবর্তী সময়ে সেই ছেলের বিয়েও দিয়েছেন। আজ ছেলে ও পুত্রবধূকে নিয়েও তাঁর সংসার। অভাবের দিন পেরিয়ে জীবনে এসেছে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য। যে মহিলা একসময় তিন মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তায় রাত কাটিয়েছেন, তিনিই নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আরও একটি শিশুকে মাতৃস্নেহে মানুষ করেছেন। ঝর্ণার এই জীবনকাহিনি তাই শুধু আত্মনির্ভরতার নয়, নিঃস্বার্থ ভালবাসারও।
এখন বয়স বেড়েছে। আগের মতো শরীরের জোর না থাকলেও মনের জোরে ভাটা পড়েনি। বর্তমানে দোকানের কাজে তাঁকে সাহায্য করেন জামাই। তবু নিজের হাতে তৈরি তেলেভাজার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেননি ঝর্ণা। আজও সেই পুরনো দোকান, সেই পরিচিত কড়াই আর ক্রেতাদের ভিড়ই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দশগ্রাম খাজুরি বাজারের মানুষের কাছে তিনি একজন পরিচিত তেলেভাজা বিক্রেতা। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্প জানলে বোঝা যায়, এই ছোট্ট দোকান আসলে কত বড় সংগ্রামের সাক্ষী।
একটি উনুন, একটি কড়াই আর দু’হাতের পরিশ্রম এই সামান্য সম্বল দিয়েই জীবনের অসম লড়াইয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন ঝর্ণা পাত্র। স্বামী হারানোর পরও ভেঙে পড়েননি। তিন মেয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। আশ্রয় দিয়েছেন অসহায় শিশুকে। আজও পরিশ্রম করে যাচ্ছেন মাথা উঁচু করে বাঁচার তাগিদে। দশগ্রামের খাজুরি বাজারে প্রতিদিন যখন গরম তেলে চপ-পেঁয়াজি ভাজেন ঝর্ণা, তখন সেই কড়াইয়ে শুধু তেলেভাজাই তৈরি হয় না। যেন নতুন করে লেখা হয় এক নারীর হার না মানা জীবনের গল্প। কারণ, ঝর্ণার কাছে তেলেভাজার দোকান নিছক রোজগারের জায়গা নয়। সেটাই তাঁর বেঁচে থাকার লড়াই, সন্তানদের বড় করার অবলম্বন, আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর গর্বিত ইতিহাস।
