রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদক চোরাচালান ও ছিনতাই প্রতিরোধ, টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ এবং ট্রেনে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যাত্রীদের তুলনায় আসনসংকট, ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ এবং প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি। বিশাল রেল নেটওয়ার্কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বাড়ানো প্রয়োজন এবং আগামী দিনে রেলওয়ে পুলিশের অগ্রাধিকার কী - এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক আমার সংবাদ বিশেষ প্রতিনিধি আলমগীর হুসাইন এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (চার্জ) ব্যারিস্টার মোঃ জিল্লুর রহমান।
বিসিএস ১৫তম ব্যাচের এই পুলিশ কর্মকর্তা সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন রেলপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা, রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব এবং রেলযাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার নানা দিক।
আমার সংবাদ: বর্তমান রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী বলে আপনি মনে করেন?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: ধন্যবাদ। আপনি যে প্রশ্নটি করলেন, রেলপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী - এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বলে আমি মনে করি, আমাদের সরবরাহের তুলনায় চাহিদার পরিমাণ বেশি। কারণ, বাংলাদেশ রেলওয়ে যে পরিমাণ যাত্রী পরিবহন করতে পারে বা যে পরিমাণ কোচ সরবরাহ করে, তার তুলনায় যাত্রীদের চাহিদা, টিকিটের চাহিদা অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করা সম্ভব হয় না। এটি একটি সমস্যা। আরেকটি সমস্যা হলো, আমরা যে পরিমাণ টিকিট সরবরাহ করি, তার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করতে চান। এর কারণ, ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলক কম, এটি নিরাপদ, দুর্ঘটনার আশঙ্কা কম এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। এসব কারণে ট্রেনে ভ্রমণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। ফলে যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেলে তাঁদের আটকে রাখা যায় না। তখন তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে ট্রেনের ছাদে ওঠেন। তাঁরা জানেন, ছাদে যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারপরও তাঁদের আটকে রাখা সম্ভব হয় না।
আমার সংবাদ: রেলে চুরি, ছিনতাই ও মাদকের যেসব খবর আমরা বিভিন্ন সময়ে পাই, এগুলো নির্মূলে আপনাদের বিশেষ কোনো কৌশল আছে কি? কীভাবে কাজ করছেন?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: মাদকদ্রব্যের বিষয়টি শুধু রেলওয়ে পুলিশ দেখভাল করে না। মাদকের যেসব রুট রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে ভারত থেকে মাদক আসে। মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়েও মাদক আসে। এসব মাদকদ্রব্য যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য অনেক সংস্থা কাজ করে। প্রথম স্তরে কাজ করে বিজিবি। এরপর কাজ করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। বিজিবি ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রয়েছে, যা পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে না। সেখানে একজন মহাপরিচালক (ডিজি) আছেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তা পরিচালক (অপারেশন) পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। বাকি কার্যক্রম মূলত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিচালনা করেন। অর্থাৎ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও জেলা পুলিশ - সবাই মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। মাদক শুধু ট্রেনে আসে না। ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস কিংবা অন্য পরিবহনেও আসতে পারে। তবে রেলও একটি অন্যতম মাধ্যম, যেটিকে মাদক পরিবহনের জন্য সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। রেলপথের এলাকা অনেক বড়, পুলিশের সংখ্যা কম এবং তল্লাশির পরিমাণও তুলনামূলক কম। এ কারণে নজরদারি এড়িয়ে ট্রেনেও মাদক পরিবহন করা হয়।
আমার সংবাদ: আপনি তল্লাশির সীমাবদ্ধতা ও জনবলসংকটের কথা বললেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের কত জনবল আছে এবং ঘাটতি কতটুকু?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: এই মুহূর্তে আমাদের জনবল ২ হাজার ৪০০-এর বেশি, প্রায় ২ হাজার ৪৫০ জন। দুই-তিন বছর আগে আমরা রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আরও ৫ হাজার জনবল চেয়ে আবেদন করেছি। ট্রেনের সংখ্যা বিবেচনায় আমরা মালবাহী ট্রেনে পুলিশ দিতে পারি না, কারণ প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এমনকি যাত্রীবাহী ট্রেনের অর্ধেকেও আমরা পুলিশ দিতে পারি। বাকি অর্ধেক যাত্রীবাহী ট্রেনে পুলিশ দেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে আমাদের জনবল প্রায় ২ হাজার ৪৫০ জন। আরও ৫ হাজার জনবল প্রয়োজন। এই অতিরিক্ত জনবল পাওয়া গেলে সব যাত্রীবাহী ট্রেন এবং মালবাহী ট্রেনেও পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) রয়েছে। এটি ১৯৮০ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। অন্যদিকে, গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) প্রায় ১৮৩০ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অর্থাৎ এই বাহিনীর বয়স প্রায় ২০০ বছর। আরএনবিতে ৩ হাজার অনুমোদিত পদ রয়েছে। তবে সেখানে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন কর্মরত আছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে হয়তো বাকি ১ হাজার ৭০০ পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আরএনবি ও রেলওয়ে পুলিশের কাজের পার্থক্য কী? রেলওয়ে পুলিশ মূলত যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আমরা আসামিকে গ্রেপ্তার করি। আমাদের ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৩২টি ফাঁড়ি রয়েছে। ২৪টি রেলওয়ে থানায় মামলা করা, তদন্ত করা, আসামিদের গ্রেপ্তার করা এবং আদালতে সোপর্দ করার কাজ আমরা করি।
অন্যদিকে, আরএনবির কাজ মূলত রেলওয়ের সম্পত্তি পাহারা দেওয়া। রেলওয়ের বিশাল সম্পত্তি রয়েছে এবং রেললাইন প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। একটি ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর স্টেশনে থামে। পরে ট্রেনটি ধোয়া-মোছা ও পরিষ্কার করার জন্য রাখা হলে, সেই ট্রেন পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আরএনবির। একইভাবে রাতে ট্রেন স্টেশনে বা প্ল্যাটফর্মে থাকলে সেটি পাহারা দেয় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী। অর্থাৎ রেলওয়ের সম্পদ ও সম্পত্তি পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আরএনবির। আর ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসার পর যাত্রার শুরু থেকে গন্তব্য পর্যন্ত যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব। ট্রেনে অবৈধ মালামাল বা অস্ত্র বহন করা হচ্ছে কি না, টিকিটের কালোবাজারি হচ্ছে কি না কিংবা কেউ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছেন কি না, সেসব বিষয়েও পুলিশ নজরদারি করে। যদিও টিকিট পরীক্ষা করা মূলত টিকিট পরীক্ষকদের দায়িত্ব, তবে তাঁরা রেলওয়ে পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন।
আমার সংবাদ: রেলওয়ের বিশাল এলাকা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় প্রযুক্তিনির্ভর কোনো ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন কি? পুরো এলাকা মনিটরিংয়ের আওতায় আনার প্রয়োজন মনে করেন কি?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা নিজেদের অর্থায়নে তিনটি ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলাম। কয়েকটি স্টেশনেও ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। তবে এটি মূলত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রধান হলেন মহাপরিচালক। এ বিষয়ে তাঁদের অনেকবার বলা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বড় বড় স্টেশন ইতোমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এসেছে। তবে সব স্টেশনে এখনো তা সম্ভব হয়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তাঁরা এ ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছেন।
আমার সংবাদ: রাজশাহী ও ঢাকায় অগ্নিসংযোগসহ নানা নাশকতার ঘটনা সামনে আসছে। একের পর এক এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে বলে মনে করেন কি?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: ধরুন, কোনো একটি পরিবারে দ্বিতীয় স্ত্রী এলেন এবং প্রথম স্ত্রীর সন্তান রয়েছে। ওই স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা দেবর-ভাসুরের মনোমালিন্য হলে রাগ মেটানোর জন্য তিনি গিয়ে প্রথম স্ত্রীর সন্তানকে বিনা কারণে মারধর করলেন। আমাদের রেলওয়ের অবস্থাও অনেকটা এ রকম। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি এলে রেলওয়েকে খুব সহজ ও সস্তা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এখানে আগুন দেওয়া হয়, ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। কারণ, রেলওয়ের এলাকা অনেক বিশাল। আমাদের রেলওয়ে পুলিশে প্রায় আড়াই হাজার সদস্য এবং আরএনবিতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন রয়েছেন। সব মিলিয়ে ৪ হাজারেরও কম জনবল দিয়ে পুরো এলাকা নিরাপত্তার আওতায় রাখা সম্ভব নয়। এ কারণে রেলওয়ে একটি সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। যেকোনো রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিরোধী দলে থাকা দলগুলো সহজেই এখানে হামলা ও নাশকতা চালাতে পারে বলে আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই।
আমার সংবাদ: আরএনবির কাজ রেলওয়ের সম্পত্তি রক্ষা করা। কোনো রাজনৈতিক দল ট্রেনে আগুন দিলে সেটি পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কি আরএনবির ওপরও বর্তায়, নাকি শুধু রেলওয়ে পুলিশের?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: অবশ্যই আরএনবির ওপরও বর্তায়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তদন্ত করা হয়। তদন্তে যদি দেখা যায়, রেলওয়ে পুলিশের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল, তাহলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর আরএনবির গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আপনাকে আরেকটি বিষয় বলি। রেলওয়ে পুলিশ ও আরএনবি ছাড়াও রেলওয়েতে কি-ম্যান ও ওয়েম্যান রয়েছেন। তাঁদের কাজ হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর রেললাইন পরীক্ষা করা। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় যখন রেললাইনের স্ক্রু বা ফিশপ্লেট খুলে ফেলা হয়, তখন তাঁরা এসব বিষয় পরীক্ষা করেন। হরতাল-অবরোধের সময় ফিশপ্লেট উল্টে দেওয়া বা স্ক্রু খুলে ফেলা প্রতিরোধ ও শনাক্ত করার দায়িত্ব মূলত কি-ম্যান ও ওয়েম্যানদের। তাঁরা কোনো অস্বাভাবিকতা বা অনিয়ম দেখলে আরএনবি বা রেলওয়ে পুলিশকে জানান। প্রয়োজনে ট্রেনের গার্ড, চালক বা স্টেশন ম্যানেজারকে বিপৎসংকেত দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বলেন। পরে কি-ম্যান ও ওয়েম্যানদের মাধ্যমে সমস্যাটি ঠিক করে ট্রেন চলাচল শুরু করা হয়।
আমার সংবাদ: রেলওয়ের এলাকাকে মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। মাদকের হটস্পট হিসেবে কোনো রুট শনাক্ত করতে পেরেছেন কি? এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কি?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: মূলত কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বেনাপোল ও দর্শনা এলাকা মাদক পরিবহনের রুট হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। আমরা এসব রুট সম্পর্কে জানি। সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয় এবং মাদকসহ অনেকে আটক হচ্ছেন। পত্রিকায় প্রায়ই ১২ কেজি গাঁজা বা বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলসহ আটকের খবর প্রকাশিত হয়। তবে সমস্যার পরিধি অনেক বড়। একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ৫০০ থেকে ৬০০ যাত্রী থাকেন, বগি থাকে প্রায় ৩০টি, অথচ পুলিশ থাকেন মাত্র ৩ থেকে ৪ জন। এক বগি থেকে অন্য বগিতে যেতে আধা ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। তাই বিমানের মতো ট্রেনেও ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রেনে টিজি পার্টি বা ট্রেন গার্ড থাকেন। টিজি পার্টির প্রধান নিজের পরিচয় দিয়ে জানান, ঢাকা থেকে রাজশাহী বা চট্টগ্রাম যাত্রায় তিনি ও তাঁর তিন সহকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন এবং তাঁদের মোবাইল নম্বর কত। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কিংবা ছিনতাই বা অন্য অপরাধের শিকার হলে যাত্রীরা তাঁদের ফোন করতে পারেন। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
আমার সংবাদ: ঈদ-পূজায় ট্রেনের ভেতরে ও ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা দেখা যায়। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: আমি আগেই বলেছি, এখানে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা যদি ১০০ হয়, আমরা সরবরাহ করি ৫০টি। কিন্তু ১০০ জন মানুষই গন্তব্যে যেতে চান। ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলক কম, ভ্রমণ নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় বলে বাকি ৫০ জনও মনে করেন, ছাদে হলেও তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছাবেন। ছাদে ওঠা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কমলাপুর বা বিমানবন্দরের মতো বিশাল স্টেশনে পুলিশ থাকেন ২ থেকে ৩ জন, আরএনবির সদস্য থাকেন ২ জন। মোট পাঁচজন দিয়ে এত বড় স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পুলিশ একদিকে গেলে যাত্রীরা অন্যদিকে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া ট্রেন স্টেশনে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড বা এক মিনিট থামে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অনেকে ছাদে উঠে পড়েন। আরেকটি সমস্যা হলো, স্টেশনগুলোতে চারদিকে পর্যাপ্ত ঘেরাও বা বেড়ার ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিক সময়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও ঈদ বা পূজার মতো উৎসবে শতভাগ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমার সংবাদ: অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও অনেকে টিকিটের কালোবাজারির অভিযোগ করছেন এবং নানা সমস্যায় পড়ছেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: এখন আর আগের মতো ব্যাপকভাবে কালোবাজারি হয় না। তবে সমস্যা হলো, একটি আইডি দিয়ে চারটির বেশি টিকিট কাটা যায় না। কিন্তু অসাধু চক্র ১০ থেকে ১৫টি আইডি ব্যবহার করে ৬০টি টিকিট কেটে ফেলে। পরে সেগুলো নিজেদের কাছে রেখে বেশি দামে বিক্রি করে। আলাদা আলাদা আইডি ব্যবহার করায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষে এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে আমরা তাদের ধরছি, গ্রেপ্তার করছি এবং ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন টিকিটিং চালু হওয়ার পর ব্যাপক কালোবাজারি অনেকাংশে কমেছে। কীভাবে ব্যবস্থাটিকে আরও উন্নত করে কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে আমরা রেলওয়েকে জানিয়েছি। শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
আমার সংবাদ: নারীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন কি?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: যেসব স্টেশনে রেলওয়ে থানা রয়েছে, সেখানে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক আছে। আর যেখানে থানা নেই বা বড় বড় স্টেশন রয়েছে, যেমন কমলাপুর, বিমানবন্দর ও টঙ্গী, সেখানে পুলিশ হেল্প ডেস্ক রয়েছে। সেখানে আমাদের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। নারী, শিশু কিংবা সাধারণ যাত্রীরা জিডি, মামলা, ছিনতাই-সংক্রান্ত অভিযোগ বা যেকোনো তথ্যের জন্য পুলিশের আইনি সহায়তা নিতে পারেন।
আমার সংবাদ: সিসিটিভির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কমলাপুরে ওয়াশফিটের ট্রেনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা গেছে কি?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হয় বলেই কমলাপুরে ওয়াশফিটের ট্রেনে আগুন দেওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের দুজনই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের একজন রেলওয়ের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারী, যিনি তাঁর জীবনের শুরুর দিকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। আশা করছি, দ্রুত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
আমার সংবাদ: ৫ আগস্টের আগে ও পরের পুলিশিং ব্যবস্থা কীভাবে দেখছেন? একজন ব্যারিস্টার, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন।
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: ৫ আগস্টের আগে শেখ হাসিনা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুশি করতে পুলিশ খুব মরিয়া ছিল। তখন তারা নিয়মকানুন মানত না, যাকে-তাকে আটক, গুম বা গ্রেপ্তার করত। ৫ আগস্টের পরে, বিশেষ করে ড. ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ ধরনের ঘটনা ছিল না। তবে তখন সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করা বা মব কালচারের অনেক ঘটনা ঘটেছে।
আর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে আওয়ামী লীগ আমলের গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের ঘটনা নেই। আবার ড. ইউনূসের আমলের মব কালচারও গত কয়েক মাসে নেই। তবে সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেড় বছরের ড. ইউনূস সরকারের আমলে পুলিশ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে হতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন বর্তমান আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র সচিবের দিকনির্দেশনায় আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। পুলিশের সদস্যরাও আইনের মধ্যে থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্টের পর পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিব ও এসবি প্রধান মনিরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে পুলিশ সদস্যদের মনে একধরনের অজানা ভয় বা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাঁরাও এমন বিপদে পড়বেন কি না। এই ভয় কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি, আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আইজিপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাতে আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারব বলে আশা করছি।
আমার সংবাদ: আগামী তিন বছরে রেলওয়ে পুলিশের তিন বা চারটি বড় পরিবর্তনের কথা বললে কোনগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: আমি চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেব।
১. ট্রেনের ছাদে যাত্রা শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা।
২. রেলে অপমৃত্যুর সংখ্যা, বিশেষ করে আত্মহত্যা, পুলিশি নজরদারি ও সচেতনতা বাড়িয়ে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।
৩. ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা। এ ঘটনায় শিশু-কিশোর কিংবা বাসের যাত্রীরা জড়িত থাকে। পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় মামলা করা এবং ১২ বছরের বেশি বয়সীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা। কিছুদিন আগে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী গুরুত্বর আহত হয়েছিলেন।
৪. জনবল বাড়ানো। রেলওয়ে পুলিশ ও আরএনবির জনবল দ্বিগুণ করে মাদকের ভয়াবহতা ও মাদক পরিবহনের রুট বন্ধের চেষ্টা করা। আমার মনে হয়, এই বিষয়গুলো আগে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
আমার সংবাদ: রেলওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে সাধারণ মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: রেলওয়ে সরকারি সম্পদ। এটিকে নিজের সম্পদ মনে করে কেউ ক্ষতি করবেন না। সরকার রেলওয়েতে বিশাল ভর্তুকি দেয়। গড়ে দুই টাকা খরচ করলে এক টাকা আয় হয়, অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়। আপনারা ট্রেনে আগুন দেবেন না, ককটেল নিক্ষেপ করবেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর, দাবি আদায়ের অনেক পথ রয়েছে। অনুগ্রহ করে রেলওয়ের সম্পদে আগুন দেবেন না, ক্ষতি করবেন না। সাধারণ যাত্রীরাও টিকিটের কালোবাজারি থেকে টিকিট কেনা কিংবা বিনা টিকিটে ভ্রমণ করা বন্ধ করুন। রেলওয়ে আপনাদের সম্পদ। তাই এই সম্পদ রক্ষায় আপনারাও এগিয়ে আসুন।
আমার সংবাদ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। আমার সংবাদ জন্য শুভকামনা।
জেএইচআর
