২০২৭ সালে অঞ্চলটির অর্থনীতিতে ৯ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানি ব্যাহত হওয়ায় চলতি বছর সংকুচিত হতে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয় দেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অঞ্চলটির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ সংকোচন হতে পারে। তবে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হলে আগামী বছর অর্থনীতিতে বড় ধরনের পুনরুদ্ধার ঘটতে পারে। ২০২৭ সালে অঞ্চলটির অর্থনীতিতে ৯ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। খবর দ্য ন্যাশনাল।
দুবাইয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইএমএফের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে গত এপ্রিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করেছিল আইএমএফ। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হিসাব ৬ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছর অঞ্চলটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয় সদস্য দেশ হলো বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমান। দেশগুলোর অর্থনীতি তেল ও গ্যাস উত্তোলন এবং রফতানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইরান যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি উৎপাদন, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, পর্যটন ও বাণিজ্য। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা ও ভোক্তাদের আস্থাও। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলোয়।
আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগের পরিচালক জিহাদ আজুর বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে অঞ্চলের দেশগুলো ভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও অন্য দেশগুলোকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে গত এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় এখন আঞ্চলিক অর্থনীতির চিত্র অনেকটাই দুর্বল।’
তিনি জানান, জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনে বিঘ্নের কারণে তেল রফতানিকারক দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্যও এ সংঘাত বড় ধাক্কা।
সবচেয়ে বেশি সংকোচন কুয়েত ও কাতারে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোয় সমানভাবে পড়েনি। তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং রফতানি কমে যাওয়ায় বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বাহরাইনের অর্থনীতি ১১ দশমিক ৩ শতাংশ, কুয়েতের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কাতারের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচন হতে পারে।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে সংকোচনের হার তুলনামূলক কম হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। চলতি বছর সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে চলতি বছর যে সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, তার মাত্রা কভিড-১৯ মহামারীর সময়কার পরিস্থিতির কাছাকাছি। ওই সময় ২০২০ সালে এ ছয় দেশের সম্মিলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
তেলবহির্ভূত খাতেও নেতিবাচক প্রভাব
উপসাগরীয় অর্থনীতির সংকোচনের প্রধান কারণ জ্বালানি খাতের উৎপাদন ও রফতানি কমে যাওয়া। তবে এর প্রভাব শুধু তেল ও গ্যাস খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটন, বাণিজ্য, পরিবহনসহ অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলবহির্ভূত অর্থনীতিও দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২৭ সালে খাতটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখতে পারে।
যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইএমএফের তথ্যানুযায়ী, সংঘাতে সরাসরি প্রভাবিত দেশগুলোয় জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদন ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ৩ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মে মাসে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এ সময় কাতারের উৎপাদন কমেছিল সর্বোচ্চ ৮৬ শতাংশ।
বিকল্প বাণিজ্যপথ ও অর্থনৈতিক সংস্কারে ভরসা
যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচতে নিজেদের বাণিজ্যপথ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে উপসাগরীয় দেশগুলো। পণ্য পরিবহনের জন্য একক কোনো পথ বা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে তারা বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করছে এবং অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
আইএমএফের মতে, বাণিজ্যিক রুটে বৈচিত্র্য আনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ করার কারণেই দেশগুলো বর্তমান বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটের ধাক্কা কিছুটা হলেও সামলে নিতে পেরেছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিকল্প পথে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশটি লোহিত সাগরসংলগ্ন অবকাঠামো ব্যবহার করে তেল পরিবহনের প্রবাহ অন্য পথে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব দেশটির ওপর তুলনামূলক কম পড়েছে বলে মনে করেন জিহাদ আজুর।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আজুরের মতে, দেশটির অর্থনীতি এ ধরনের চাপ সামলানোর সক্ষমতা রাখে। সৌদি আরব এখনো দৈনিক ৫০-৬০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করছে। দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতির সক্ষমতাও সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করছে।
সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সংঘাতের বিস্তার। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক হাসান আলহাসান বলেন, ‘নতুন করে যুদ্ধ বাড়লে তা উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। ভূরাজনীতি এখন শুধু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেই প্রভাবিত করছে না, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
