সৌদি আরবে কিশোর বয়সে বিক্ষোভ ও জানাজায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন ইউসুফ আল-মানাসিফ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এমন সময়ের, যখন তার বয়স ছিল ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে যেকোনো সময় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ইউসুফকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং কয়েকটি জানাজায় উপস্থিত থাকার অভিযোগ আনা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই জানাজাগুলোকে বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করে।
পরে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য গঠিত দেশটির বিশেষ ফৌজদারি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, সর্বোচ্চ আদালতে সাজা বহাল থাকায় মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ
মানবাধিকার সংস্থা রিপ্রিভের অভিযোগ, গ্রেফতারের পর ইউসুফকে নির্যাতন করা হয় এবং জোর করে মিথ্যা স্বীকারোক্তিতে সই করানো হয়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারের পাঁচ বছর পর ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান তিনি।
ইউসুফের পরিবারের সদস্যরা এখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, মুখ খুললে তারা হয়রানি কিংবা গ্রেফতারের শিকার হতে পারেন।
রিপ্রিভ ও ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের পরামর্শক দুয়া ধাইনি বলেন, ইউসুফের পরিবারের সদস্যদের এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ
২০২০ সালে সৌদি আরব অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে এরপরও অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
রিপ্রিভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে আনা অপরাধের ঘটনা ঘটেছিল তারা শিশু থাকা অবস্থায়।
এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিলে আলি আল-সুবাইতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তার সঙ্গে তার চাচা মুস্তাফা আল-সুবাইতিকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রিপ্রিভের তথ্য অনুযায়ী, আলির বয়স যখন ১২ বছর, তখন সংঘটিত অহিংস ‘সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত’ অপরাধের অভিযোগে তাকে দণ্ডিত করা হয়েছিল।
ইউসুফের মামলা নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ১৮ বছরের কম বয়সে সংঘটিত অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত অহিংস অপরাধের জন্য ইউসুফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আরও গুরুতর অবনতি হবে।
দুয়া ধাইনি বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নিয়ম না মানা ব্যক্তিদের হুমকি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন। তার মতে, ইউসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ১৮ বছরের কম বয়সে সংঘটিত ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক, যাদের মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।