ইন্টারনেটের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাইবার হামলার অনুকরণে পরীক্ষা চালাতে বিশেষ দল গঠন করছে জাপান। দেশটির শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এ উদ্যোগের কথা জানান। প্রযুক্তিব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করে সেগুলো ঠিক করার মাধ্যমে সম্ভাব্য সাইবার হামলা ঠেকানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
চলতি সপ্তাহে পিএইচপির গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যায়। এই ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা লাখ লাখবার হামলার চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। কেউ কেউ সাময়িকভাবে নিজেদের ব্যবস্থা বন্ধ রাখে।
জাপানের তৃতীয় বৃহত্তম মুঠোফোন অপারেটর সফটব্যাংক নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলায় তাদের জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে এ সময়ে গ্রাহকেরা ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিকম্প, সুনামি ও দুর্যোগসংক্রান্ত আগাম সতর্কবার্তা পাবেন না। তবে বিকল্প সেবার মাধ্যমে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জাপানে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। দেশটি বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এর মধ্যে বর্তমানে দেশটির দক্ষিণের ওকিনাওয়া অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় চাম্পি। ৩ কোটির বেশি স্মার্টফোন গ্রাহক থাকা সফটব্যাংক জানিয়েছে, তাদের গ্রাহকেরা ইয়াহুর একটি অ্যাপসহ অন্যান্য সেবার মাধ্যমে ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পেতে পারবেন।
জাপানের শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া শুক্রবার বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি দুর্বল ফাঁক দিয়েই হামলাকারীরা সফল হতে পারে। এ কারণে আমাদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং হামলাকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখতে হবে। যাঁরা নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদেরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে হবে এবং আগেভাগে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে হামলাকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা যায়।
তবে টোকিওভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডজে করপোরেশনের প্রধান নোবুও মিওয়া সরকারের পদক্ষেপকে ধীর বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এটা যেন বাঁশের বর্শা নিয়ে বোমারু বিমানের মোকাবিলা করার চেষ্টা।
চলতি সপ্তাহে টোকিও থেকে ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ব্যাংক, বিমান সংস্থা, রেল, কর ও সরকারি সেবার ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কয়েক দশক ধরে ইন্টারনেট সচল রাখতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে এটি অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাপানের নোমুরা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মিতসুবিশি ইউএফজে ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ, বিমান সংস্থা এএনএ এবং পূর্ব জাপান রেলওয়ে সাময়িকভাবে তাদের কিছু অনলাইন সেবা বন্ধ রাখে। জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় কর সংস্থা ও আবহাওয়া সংস্থাও কিছু অনলাইন সেবা স্থগিত করে।
শুক্রবার পূর্ব জাপান রেলওয়ে জানায়, তাদের গ্রুপের কিছু সেবা আবার চালু হয়েছে। নিরাপদ বলে নিশ্চিত হওয়ার পর অন্য সেবাগুলোও চালু করা হবে। রং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন পেইন্ট জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা নিরাপত্তা সংশোধনী যুক্ত করেছে। এরপর তাদের ওয়েবসাইট আবার চালু হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইভা চেন বলেন, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষিত থাকে বলে সাইবার হামলাকারীরা সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এখন ভাষাগত বাধাও আর আগের মতো নেই।
তাঁর মতে, জাপান নিজেদের বিদ্যমান প্রযুক্তিব্যবস্থাকে যথেষ্ট নিরাপদ মনে করে অতিরিক্ত নিশ্চিন্ত ছিল।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে হামলাকারীরা এখন সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি পর্যন্ত অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারছে। এতে সাইবার অপরাধ দ্রুত, কম খরচে এবং শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
পিএইচপি হলো এইচটিএমএল ও পাইথনের মতো একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, যা বহু ওয়েবসাইট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর নির্মাতারা বুধবার কয়েক বছর ধরে সফটওয়্যারের মধ্যে থাকা নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোর সমাধান প্রকাশ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এসব ত্রুটি শনাক্ত করা হয়। ব্যবহারকারীদের দ্রুত সফটওয়্যার হালনাগাদ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা।
রয়টার্স
খুলনা গেজেট/এএজে
