অশান্ত বিশ্বে শান্তি, মৈত্রী ও কল্যাণ কামনার মধ্য দিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে উদযাপিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র প্রবারণা পূর্ণিমা।
সকাল থেকে ধর্মীয় নানা আয়োজন এবং সন্ধ্যায় ফানুস উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে প্রবারণা পূর্ণিমা।
সন্ধ্যা নামতেই চট্টগ্রামের আকাশ এক অদ্ভুত রূপে রঙিন হয়ে ওঠে। একের পর এক ফানুস উড়ে যায় দূরের নীলিমায়, আলোর ক্ষুদ্র জ্যোৎস্না যেন পুরো শহরকে জাদুর ঝলকানি দিয়ে আলোকিত করছে।
রবিবার সকাল থেকে নন্দন কানন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সন্ধ্যায় বর্ণিল ফানুসের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশ। ফানুস ছাড়াও ছিল আতশবাজির ফোয়ারা।
চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে এ বৌদ্ধমন্দিরেই সবচেয়ে বড় ফানুস উৎসব। যেখানে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ফানুস ওড়ানো হয়। বৌদ্ধমন্দির ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের টিমও।
ঢোলের বোলে নেচে গেয়ে তরুণ-তরুণীরা আনন্দে মেতে ওঠেন। অনেকের পরনে ছিল একই রঙের পোশাক, টিশার্ট। অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিদেশিরাও। ফানুস উৎসবকে ঘিরে ছোটখাটো মেলা বসেছে মন্দিরকে ঘিরে। শুধু যে বৌদ্ধরা এ উৎসবে অংশ নিয়েছেন তা নয়, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ফানুস ওড়ানো দেখতে আসেন এখানে।
রোববার সকালে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহার, কাতালগঞ্জ নবপণ্ডিত বিহার, দেবপাহাড় পূর্ণাচার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, আগ্রাবাদ শাক্যমুনি মহাশশ্মান বৌদ্ধ বিহার এবং মমিন রোডের সর্বজনীন বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
ভোরে তথাগত গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল ও পূজা নিবেদন, জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন এবং পবিত্র ত্রিপিটক থেকে সমবেত পাঠ করা হয়। দিনভর বুদ্ধপূজা, সংঘদান, পিন্ডদান, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণসহ নানা আয়োজনে মুখর ছিল বিহার প্রাঙ্গণ।
সন্ধ্যার পর উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে আকাশকে আলোকিত করে ওড়ানো হয় শত শত রঙিন ফানুস। হাতি, ময়ূর, মাছ ও মটকাসহ নানা আকৃতির আকর্ষণীয় নকশাদার ফানুস উড়িয়ে বিশ্বশান্তি ও মানবজাতির কল্যাণ প্রার্থনা করেন পূণ্যার্থীরা। ফানুসের পাশাপাশি আতশবাজির রোশনাই পুরো পরিবেশকে উৎসবমুখর করে তোলে।
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক সজল বড়ুয়া বলেন, অশান্ত বিশ্বে শান্তি ও সুখ কামনায় প্রার্থনা করা হয় ফানুস উৎসবে।
ভোরে তথাগত গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল ও পূজা নিবেদন এবং সমবেত প্রার্থনা হয়। এরপর পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ হয়।
এছাড়া ভিক্ষু সংঘের সূত্রপাঠ, সকল প্রাণি ও পরলোকগত জ্ঞাতিদের উদ্দেশে পারলৌকিক সদগতি ও মঙ্গল কামনা এবং বিশ্বশান্তি কামনায় জল উৎসর্গ করা হয়।
তিনি বলেন, তিন মাসের বর্ষা বাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার আয়োজন করা হয়। আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত তিন মাস বর্ষা ব্রত পালন করেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় বর্ষা বাসের।
“মানুষের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা ও মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটানোর জন্য প্রবারণা পূর্ণিমা যুগপোযোগী একটি উৎসব।
সম্মিলিত প্রবারণা উৎসব উদযাপন পরিষদের প্রধান সমন্নয়ক ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রুবেল বড়ুয়া বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও চট্টগ্রাম তথা দেশের প্রচীনতম নন্দনকানন বৌদ্ধমন্দিরে প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
আমাদের ধর্মের মূল বাণী শান্তি। গৌতম বুদ্ধের চুল স্বর্গে গমনের স্মৃতিকে জাগরূক রাখতে এ ফানুস ওড়ানো হয়। তিন মাস বৌদ্ধভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালনের পর এ উৎসবের আয়োজন। অহিংসা পরম ধর্ম। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, শান্তিময় বিশ্ব হোক এটাই আমাদের চাওয়া। ফানুস ওড়ানোর জন্য অনেক দূর দূরান্ত থেকে আমাদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নারী- পুরুষ, তরুণ তরুণী থেকে শুরু করে একেবারে কোলে শিশু পর্যন্ত এই মন্দরে সমবেত হয়েছে। আর এই উৎসব সামিল হয়েছেন সকল ধর্মের মানুষ। প্রবারণার ফানুস উৎসব উপভোগ করতে অনেক দূর দূরান্ত থেকে নানান শ্রেণি পেশার মানুষের সমাগম ঘটেছে এখানে।
নন্দনকানন বৌদ্ধমন্দির ছাড়াও নগরের বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দির, রাউজান, ফটিকছড়ি, পটিয়া, বাঁশখালীসহ প্রায় সব উপজেলার বৌদ্ধমন্দির থেকে ফানুস উড়ানো হয়েছে।
বৌদ্ধ সংগঠক ও লেখক সুরজিৎ চৌধুরী সাজু বলেন, এ অঞ্চলের মধ্যে নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহারের প্রবারণা পূর্ণিমা ও ফানুস ওড়ানোর উৎসব ধর্মীয় দিক ছাড়াও ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক দিয়ে অনন্য। প্রতি বছরই প্রবারণার ফানুস ওড়ানোর উৎসব উপভোগ করতে হাজার হাজার নানান ধর্মের নারী- পুরুষের সমাগম ঘটে। এ বছর এই সমাগম আরও বেশি।
তিনি বলেন, সকাল থেকে বুদ্ধপূজা, ফুল পূজা, মোমবাতি প্রজ্বলন, পঞ্চশীল, অষ্টশীল প্রার্থনাসহ নানা আচার ও আনুষ্ঠানিকতা ছিল বৌদ্ধমন্দিরে। বিকেলের পর থেকে শুরু হয়েছে ফানুস ওড়ানো। শুধু যে বৌদ্ধরা এ উৎসবে অংশ নিয়েছেন তা নয়, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ফানুস ওড়ানো দেখতে আসেন এখানে।
প্রতিবারের মতো এ বছরও বিদেশিরাও এসেছেন প্রবারণার ফানুস ওড়ানোর উৎসবে। ফানুস উৎসবকে ঘিরে বসেছে মেলা। মন্দিরকে ঘিরে লোকে লোকারণ্য
হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রবরণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দানোৎসব-২০২৬ উদযাপন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামকে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, নান্দনিক ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ঐতিহ্যগতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নগরী। এ নগরে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে বসবাস করবে। কোনো অপশক্তি যেন নগরীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ নগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও গৌতম বুদ্ধের জন্মস্মৃতির প্রসঙ্গ তুলে মেয়র বলেন, গৌতম বুদ্ধের জন্মের সঙ্গে পদ্মফুলের যে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য জড়িয়ে আছে, সেই ভাবনা থেকেই বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় গুরুদের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী এ উদ্যোগকে আরও নান্দনিকভাবে সাজানো হবে। এ ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নতুন নকশা ও পরামর্শ দেওয়া হলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্ব তুলে ধরে মেয়র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
তিনি বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামকে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক নগরীতে পরিণত করতে হবে।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মেয়র বলেন, নগরীর কালুরঘাট এলাকায় তাদের জন্য একটি জায়গা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
সম্মিলিত প্রবারণা উৎসব উদযাপন পরিষদের প্রধান সমন্নয়ক ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রুবেল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলীসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু, নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখপন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম নিউজ / আরএমকে/
The post শান্তির বার্তা নিয়ে চট্টগ্রামের আকাশে প্রবারণার ফানুসের আলোর ভেলা appeared first on চট্টগ্রাম নিউজ.
