আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের কক্ষচ্যুতি নতুন কিছু নয় বরং সেই ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই। তখন থেকেই আমলারা রাজনীতিকদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেন। এঁরা উচ্চশিক্ষত ও মেধাবী হওয়ায় রাজনীতিকরা তাদের কাছে খুব একটা সুবিধা করতে পারতেন না। তবু রাজনীতিক ও আমলাদের মধ্যে তখন মোটামোটি ভারসাম্য ছিলো। বিগত প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সে অবস্থার বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। ক্ষমতার মোহে আওয়ামী লীগ পুরো আমলাতন্ত্রকেই ধ্বংস করে দিয়ে একেবারে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
ফলে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও সীমালঙ্ঘন আমাদের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রাচারের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা এখন চরমে উঠেছে। আমাদের দেশে সরকার ও নির্বাহী বিভাগ বা আমলাতন্ত্রের মধ্যে সেতুবন্ধন না থাকায় দেশে সুশাসন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অধিকারের পরিবর্তে অনাধিকারই জোরালো ভিত্তি পেয়েছে। যা কাঙ্ক্ষিত না হলেও এটাই এখন বাস্তবতা। সাজাহান নাটকে নাট্যকার দিজেন্দ্রলাল রায় ‘দিলদার’ চরিত্রের মাধ্যমে একটি পরিহাসের অবতারণা করেছিলেন। নাটকের এক সংলাপে শাহজাদা সুজার বিদুষক ‘দিলদার’ জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন, ‘কুকুর; না লেজের শক্তি বেশি?
দিলদারের সপ্রতিভ জবাব, কুকুরের। কারণ, কুকুর লেজ নাড়ে। এর বিপরীত হলে তো লেজই কুকুর নাড়তো’। বিষয়টি হাস্য-রসাত্মক হলেও খানিকটা কৌতুহলোদ্দীপকও। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সে স্বাভাবিকতা আর নেই। কারণ, কোন কিছুই এখন স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। মহাজন ফরিয়ার পর্যায়ে নেমে এসেছেন; আর ফরিয়ারাই এখন রীতিমত মহাজন। রাখাল মনিব প্রসব করতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র গণপ্রজাতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আমলাতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথেই যাত্রা শুরু করেছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হলেও তা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার মোহে মহান এ জাতীয় অর্জন এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।
স্বাধীনতা ও ক্ষমতা কখনো অবারিত হয় না বরং তা আইন ও সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমলাদের অবারিত ক্ষমতাচর্চার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যা রাষ্ট্রাচারে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও চাকরিবিধির কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেন না একশ্রেণির অতিউচ্চাভিলাষী আমলা। এদের অধিকাংশ আকন্ঠ দুর্নীতি ও অনিয়মে নিমজ্জিত হলেও তারা সব সময় থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন (বীর বিক্রম)-এর বক্তব্যে তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সত্য ভাসনের জন্য জনগণ তাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তিনি অনেকটা খেদোক্তি করেই বলেছেন, ‘এটা এমন এক আজব দেশ যে এদেশের আমলারা অধিকাংশই চোর’। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমলাতন্ত্রের দৌড়াত্ম্যে রাজনীতিকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে খোদ রাজনীতিকরা আত্মস্বীকৃতি দিতে শুরু করেছেন। আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হলেও রাজনীতিকদের পৌণপৌণিক ব্যর্থতার কারণেই তারাই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। অথচ সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘Every person in the service of the republic has a duty to strive at all time to serve the people’ অর্থাৎ ‘সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’।
একশ্রেণির অসাধু আমলা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করেছেন। কিন্তু এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য কারা দায়ি তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এ বিষয়ে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি, ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতি ও রাজনীতিকদের পর্বত প্রমাণ ব্যর্থতাকে জোরালোভাবে দায়ি করা হচ্ছে। আর এ বিষয়টিই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করা হচ্ছে। কারণ, রাজনীতিকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে আমাদের দেশের রাজনীতির কক্ষচ্যুতি ঘটেছে। নিকট অতীতে অরাজক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুরোপুরি সুযোগ গ্রহণ করছেন সুবিধাভোগীরা। আর এর অসহায় ভিকটিম সাধারণ মানুষ।
বিষয়টি অভিনব না হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অভিযোগে মাত্রা আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। আওয়ামী-ফ্যাসীবাদ আমলে মেঠো বিরোধী দলগুলো বিষয়টি বেশ আগে থেকে সোচ্চার হলেও জাতীয় সংসদে ‘চ্যারিটি ম্যাচ খেলা’ বিরোধী দলীয় শীর্ষ নেতার মুখেও এমন অভিযোগের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিলো। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের জিএম কাদের অনেকটা খেদোক্তি করেই বলেছিলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক জনগণ। আর তাদের ভোটে নির্বাচিতদেরই দেশ পরিচালনার কথা। কিন্তু কাজকর্মে এমপি সাহেবদের খবর নেই, আর সচিব-সাহেবরা সব কাজ করেন, মন্ত্রী মহোদয়েরা শুধু জানতে চান’। বিষয়টি জাতীয় পার্টি নেতার বিলম্বিত উপলদ্ধি ও সভ্য ভাষণের জন্য তিনি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে তিনি তার দল কম যাননি বরং প্রায় ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের সাথে গাটছাড়া বেঁধেই চলতে হয়েছে তিনি এবং তার দলকে। এখনো তিনি এবং তার দল ফ্যাসিবাদী অবগুণ্ঠনে আবদ্ধ রয়েছে।
জিএম কাদের যে পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন তাতে দেশের বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছিলো। একশ্রেণির দলান্ধ আমলারা যে জোর করে রাজনীতিতে আসছেন একথাও ঠিক নয়। রাজনীতিবিদদের উপর্যুপরি ব্যর্থতা ও ক্ষমতালিপ্সার ছিদ্রপথেই সুযোগ নিচ্ছেন তারা। আর রাজনীতিকরা ক্ষমতার খুঁটি ঠিক রাখার জন্য এসব আমলাদের বরাবরই তোষণ করে চলেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যদি আমলাতন্ত্র নির্ভর হতে হয় তাহলে আমলারা সুযোগ নেবেন এটাই স্বাভাবিক। আর একশ্রেণির আমলার কারণেই নাকি জুলাই জাতীয় সনদ আলোর মুখ দেখছে না।
মূলত, একশ্রেণির আমলাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষই দেশকে প্রান্তিকতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, এখন প্রশাসনের সচিব বা পদস্থ কর্মকর্তারা অবসরের পরই রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার খোয়াব দেখেন। এজন্য তারা গ্রাউন্ড প্রস্তুত করেন সরকারি চাকরিতে থাকার সময়ই। সরকারি চাকরিতে থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছিলো পতিত ফ্যাসিবাদী আমলে। সে সময় সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন একশ্রেণির আমলা। এমনকি কেউ কেউ বিশেষ ব্যক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন। যা চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লংঘন হলেও তদানীন্তন সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উৎসাহিতই করেছে। আর সরকারের নির্লিপ্ততার কারণেই উচ্চাভিলাষী সরকারি কর্মকর্তারা প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নানা কারণেই এক শ্রেণির আমলারা সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। আমাদের দেশে করোনা ব্যবস্থাপনা ও এনিয়ে নানা কাজে মন্ত্রী এমপিসহ মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের তেমন কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান ছিলো না বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ হয়তো কিছু করছেন। কিন্তু প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তারা অনুপস্থিত। ফলে যারা জনপ্রতিনিধি তাদের কাজ চলে গেছে আমলাদের কাছে। আমলারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। তাই তারা স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিতে কসুর করেননি। এটা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয় বরং রাজনীতিকদের বড় ধরনের ব্যর্থতা।
আমলারাও এ অযাচিত ক্ষমতা পেয়ে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার নানাবিধ অপরাধ প্রবণতায়ও জড়িয়ে পড়ছেন। দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন বেগম পাড়া সহ অগাধ সম্পদের ভাণ্ডার। তদানীন্তন জনপ্রশাসন সচিব ঢাকায় প্রশাসনের কমর্র্কতাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা এত পরিমাণ বেশি যে প্রতিদিন তিন-চারটি করে বিভাগীয় মোকদ্দমা শুনতে হচ্ছে এবং বিভাগীয় মোকদ্দমায় অনেকের শাস্তি হচ্ছে। এটা জনপ্রশাসনের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক’।
মূলত, সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার অভাবেই আমলাদের প্রভাব এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে। ক্ষমতার প্রয়োজনে আমলা নির্ভরতার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে রাজনীতিবিদদের দক্ষতার অভাবেও এটা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘রাজনীতি করবেন রাজনীতিবিদেরা। কিন্তু এখন তা করছেন আমলারা। তারা চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বক্তব্য নিকট অতীতে দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক তৎপরতাও চালিয়েছেন। ক্ষমতার দৃশ্যপট পরিবর্তনের পর দলবাজ আমলাদের গলাবাজী কিছু কমলেও তারা সময় ও সুযোগের প্রহর গুণছেন। আবার কেউ কেউ ফ্যাসিবাদকে ফিরে আনার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছেন।
আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) এমন এক ব্যবস্থা যাতে স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে সরকারের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। আমলারা জনপ্রতিনিধি নয় বা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নয়। ফলে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হলেও আমলারা পদ হারান না। এই চরিত্রের কারণে আমলাতন্ত্রে সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হয়। আমলারা হলেন সরকারের অংশ যারা অনির্বাচিত। ঐতিহাসিকভাবে, আমলারা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। যারা জনগণের ভোট দ্বারা নির্বাচিত নন। বর্তমান সময়ে, আমলাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ তথা জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্রের আইনকানুন, নীতিকৌশল আর উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করবেন, আর জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে জনপ্রশাসনের সদস্যরা জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শ ও মতামতকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নকে নিশ্চিত করবেন-এটিই তো প্রত্যাশিত। কিন্তু আমলাদের হাতেই এখন সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ। তারাই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আর রাজনীতিকদের ভূমিকা ‘ধর হে লক্ষ্মণ’ আর ‘তাল পাতার সেপাই’এর মত। যা কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য নয়।
রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতা হারাচ্ছেন আর আমলারা ক্ষমতা অর্জন করছেন একথা বলতে কোন বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না বরং গরু-ছাগল চেনার যোগ্যতা থাকলেই তা উপলব্ধি করা যায়। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা এখন ইউএনও/ডিসির কাছে পুরোপুরি অসহায়। বস্তুত জনপ্রতিনিধিরা এখন প্রায় ক্ষেত্রেই ক্ষমতাহীন সাক্ষীগোপাল মাত্র। আর বিরোধী দলের এমপিদের তো আমলারা কোন ভাবেই পাত্তা দিতে চান না। ডিসি, ইউএনওর ওপর তারা কোনভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। এ বিষয়ে একজন সাবেক সংসদ সদস্যের উপলদ্ধি গণমাধ্যমের খবরে এসেছিলো। আর তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক ও বেদনাদায়ক। তিনি এক তদবিরকারীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘কোনরকম মানসম্মান নিয়ে বেঁচে আছি, দেখো কোনোভাবে ইউএনও বা ডিসি সাহেবকে বলা যায় কিনা’! একজন সাংসদের এরচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা ও অসহায়ত্ত আর কী হতে পারে?
এ বিষয়ে সাবেক এক উপজেলা চেয়ারম্যানের অভিমত আরও বেদনাদায়ক। তার ভাষায়, ‘আমরা তো নিয়ম রক্ষার পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউএনও সাহেব রাজি না হলে কাজ হবে না’। এসব ঘটনায় প্রমাণ হয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে আমলারাই অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। আর রাজনীতিবিদরা ক্রমেই প্রাসঙ্গিতা হারাচ্ছেন। যা দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য অশনিসংকেত।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক এক নেতা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জেলায় জেলায় সচিবদের দায়িত্ব পালন নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকারের বৈশিষ্ট নয়। জনগণের সাথে সদা সম্পৃক্ত, এলাকার সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা আর সুখ-দুঃখের সাথী জনপ্রতিনিধিদের পাস কাটিয়ে সচিব আর প্রশাসনের আমলারাই যে উন্নয়ন আর থোক বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন- উক্ত বক্তব্যে তা খুবই স্পষ্ট। এক নেতা বলেছিলেন ‘জনগণের দুর্যোগে, বিপদে আপদে রাজনীতিবিদরাই কাছে থাকেন, সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জনপ্রিতিনিধিদের সহযোগিতা করা, কোনোভাবেই উন্নয়ন বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়’। কিন্তু ক্ষমতার মোহে আমলাতন্ত্রকে তারা যে ধ্বংস করেছিলেন তা একবারও স্বীকার করেননি। যা আওয়ামী লীগের ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতা।
স্বাধীনতার ৫ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদের আমলে এদেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। এ একনায়কের আমলের উপজেলা পদ্ধতিকে আমাদের খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সে সময়ে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের কাছে উপজেলার কর্মকর্তাদের কাজের জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা ছিল। পরিষদের সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুধুমাত্র সাচিবিক দায়িত্ব পালন করতেন। জনপ্রতিনিধি উপজেলা পরিষদের সদস্যরা মাসিক সভায় সামনের কাতারে আর কর্মকর্তারা পেছনের সারিতে বসতেন। কর্মকর্তারা উপজেলার মাসিক সভায় হাজির হওয়ার আগে জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হওয়ার ভয়ে তটস্থ থাকতেন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল নৈতিকতার অধিকারী কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক নাজেহালের ভয়ে আতঙ্কে সময়ের হিসাব কষতেন। পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ফলে সুশাসন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রেই চলছে নানা ধরনের অসঙ্গতি।
কারণ, আওয়ামী বাকশালী আমলে পুরো গণেশই উল্টে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিলো। তখন তো জনপ্রতিনিধিরা তটস্থ থাকতেন, কর্মকর্তাদের উচ্চ কন্ঠের ভয়ে চেয়ারম্যান সাহেবরা করুণা আর দয়া দাক্ষিণ্যের অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকেন, উপজেলা চেয়ারম্যান সভাপতির চেয়ারে বসলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করাই যেন উপস্থিত সদস্যদের একমাত্র কর্তব্য হয়ে উঠে। কোনোভাবে নির্বাহী কর্মকর্তার চক্ষুশূল হলে বাজেট বরাদ্দ কাটছাঁটের ভয়ে জনপ্রতিনিধির হৃদয় কেঁপে উঠে। আমরা এখন আমলাতান্ত্রিক গণতন্ত্র চর্চা করছি। তারাই এখন সবকিছুরই নিয়ামক। এমনকি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের অনুষঙ্গও। এরাই বিনাভোটে সংসদকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়া, দিনের ভোট রাতে করা এবং ডামী ভোটের অনুঘটক। দেশ ও জাতির জন্য এরচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে?
জাতির যেকোন সংকটে রাজনীতিকরাই ভরসা। আমলাতন্ত্রের প্রতিভূরা এখনো ‘ভাই’ বা ‘আপা’ সম্বোধনে বিব্রত বোধ করেন, বিনা অনুমতিতে দপ্তরে প্রবেশ আইনত দণ্ডনীয় বলেই বিশ্বাস করেন, এমন আমলাতন্ত্র কখনো রাজনীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের জন্য সহায়ক হতে পারে না। আমলা নির্ভরতাকে সহনীয় পর্যায়ে এনে গণপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে, কাগুজে মর্যাদা নিয়ে যতই আত্মতৃপ্তি খোঁজা হোক, তা কখনোই সম্মানজনক নয়; বরং তা রীতিমত আত্মপ্রবঞ্চনা। উন্নয়নের নামে আমলাতান্ত্রিক গণতন্ত্র জনবিচ্ছিন্নতার পথকেই করবে আরও দীর্ঘায়িত। আর এর ভিকটিম হতে হবে রাজনীতিকদেরই।
তাই দেশকে আইন ও সাংবিধানিক শাসনে ফিরিয়ে নিতে এ অশুভবৃত্ত থেকে আমাদেরকে বেড়িয়ে আসার কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারকে বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে এ বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। নিজ কক্ষপথে ফিরিয়ে আনতে হবে আমলাতন্ত্রকে। তৈরি করতে হবে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক সেতুবন্ধন। কারণ, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমলাদের অপেশাদারী ও দলবাজ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা সম্পর্কে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অগ (Ogg) বলেন, (‘The body of the civil servants is an expert, professional, non-political, permanent and subordinate staff.’) অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা হবে সুদক্ষ, পেশাদারী, অধীনস্থ কর্মকর্তা যারা স্থায়ীভাবে চাকরি করেন এবং রাজনীতির সাথে যাদের কোনো সংশ্রব নেই’। অন্যথায় গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
www.syedmasud.com
