‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে’—শুক্রবার রাতে বাবার সঙ্গে শেষ ফোনালাপে এ কথাই বলেছিলেন নাহিদুর রহমান। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে সৈকতে আনন্দে সময় কাটাচ্ছিলেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকায় ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে ইনানী সৈকতের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নাহিদ, তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। শেষ ফোনালাপের সেই কথাগুলোই এখন বারবার মনে পড়ছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের।
ছেলেসহ পরিবারের চার সদস্যের সন্ধান না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
নিখোঁজ নাহিদুর রহমানের বয়স ৪১ বছর। তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজির বয়স ৩৬ বছর। তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়ার বয়স আট বছর এবং সুনাইনা ইহানার তিন বছর। কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘‘শুক্রবার রাতেও নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। কল করে বলছিল, ‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে।’ বুধবার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু শনিবার সকালের অগ্নিকাণ্ড আমাদের সব স্বপ্ন আর হাসিখুশি শেষ করে দিল।’’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি জানান, প্রায় দেড় মাস আগে তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছেন। বুধবার আবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার। ছোট ছেলে নাহিদের সঙ্গেই ঢাকায় থাকতেন তিনি। শুক্রবার রাতেও ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে, অথচ পরদিন থেকেই পরিবারের চার সদস্যের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছিলেন নাহিদ। রাজধানীর শ্যামলীতে ‘গ্র্যান্ড পাওয়ার কম্পানি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে মিরপুরে থাকতেন। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ থাকার জন্য বুকিং দিয়েছিলেন তিনি। রিসোর্টের মেমো থেকেও বুকিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে নাহিদ ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা।
নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, ভাই, ভাবি ও দুই ভাতিজির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আগুনে পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যে চারটি মরদেহ রয়েছে, তার মধ্যে দুটি শিশু আছে। তবে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না। চেহারা চেনার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। আহতদের মধ্যেও আমার ভাই, ভাবি নেই। পরিচয় শনাক্তের জন্য চেষ্টা চলছে। এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না।’
তিনি আরো জানান, ‘টুপটুপ রিসোর্টের’ মেমো থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে থাকার জন্য বুকিং দিয়েছিলেন নাহিদ।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে। বাকি চারজনের মরদেহ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
