Published on
:
2 min read
নীলাঞ্জন দাস, রায়গঞ্জ
নেই জমিদার, নেই জমিদারি। নাগর নদীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ আজ অতীতের ইতিহাসের সাক্ষী। এক সময়ের জমিদারবাড়ির জৌলুস হারিয়েছে কালের নিয়মে। শহুরে উত্তরসূরিরাও আর ফিরে তাকান না সেই ভিটের দিকে। তবু ঐতিহ্যের টানে প্রায় ৪২ বছর ধরে রায়গঞ্জের বাহিন গ্রামের বাসিন্দারাই ধরে রেখেছেন জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো। জমিদারি আমলের গ্রামে ঢোল পিটিয়ে পুজোর খবর জানানোর প্রথাও আজও চালু রেখেছেন তাঁরা।
উত্তর দিনাজপুরের এই ঐতিহ্যবাহী পুজোর বয়স ঠিক কত, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই পুজো। অবিভক্ত বাংলাদেশের দিনাজপুরের জমিদার রুদ্রপ্রতাপ চৌধুরীর জমিদারি ছিল বাহিন, কুমারজল, মাকড়া, মধুপুর ও লহুজগ্রাম-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায়।
নাগর নদীর ধারেই ছিল তাঁর প্রাসাদোপম অট্টালিকা। এক সময়ে দুর্গাপুজোকে ঘিরে সাত দিন ধরে চলত ভূরিভোজ ও আমোদ-প্রমোদ। বসত যাত্রাপালা, থিয়েটার, সার্কাস এবং বিশাল মেলা। দূরদূরান্ত থেকে জমিদারদের আত্মীয়স্বজন আসতেন। পুজোর দিনগুলিতে উৎসবে মাততেন এলাকার মানুষও।
সময় বদলেছে। জমিদার রুদ্রপ্রতাপের উত্তরসূরিরা বহু দিন আগেই বাড়ি ছেড়েছেন। পড়ে রয়েছে ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ, আর রয়ে গিয়েছে কিছু স্মৃতি। সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন গ্রামের সাধারণ মানুষের কাঁধে। ৪২ বছর ধরে চাঁদা তুলে সার্বজনীন দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন তাঁরা। আধুনিক মাইকিংয়ের পাশাপাশি ঢোল পিটিয়ে গ্রামবাসীদের পুজোর কথা জানানোর প্রথাও বজায় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ফুদুন রায় দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করছেন।
দশমীতে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ মেলার আয়োজন করেন। সেই মেলাই আজও পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। পুজো কমিটির সভাপতি তথা স্থানীয় বাসিন্দা সমর দাস বলেন, 'জমিদারদের আমলে আমি তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম। একচালা প্রতিমা, বিরাট ঝাড়বাতি, বিভিন্ন জায়গা থেকে আত্মীয়দের আসা-সবই দেখেছি।
আমরা পুজো দেখতে যেতাম। বারোয়ারি পুজো হওয়ার পরে আর একচালা প্রতিমা হয় না। আয়োজন কমলেও অন্নভোগ, লুচি, পায়েস, দই-মিষ্টি ও ফল দেওয়া হয়। নবমীতে খিচুড়ি ভোগ বিতরণ করা হয়। দশমীতে বসে মেলা।'
জমিদারির সেই আড়ম্বর আজ ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু ঢোলের শব্দ, ভোগের আয়োজন আর দশমীর মেলাকে আঁকড়ে বাহিনের মানুষ আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের শিকড়ের টান। ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের নীরবতা আর উৎসবমুখর পুজো মণ্ডপের এই বৈপরীত্যই এখানে সত্যি। সেটাই বাঁচিয়ে রাখতে চান বাহিনের মানুষরা।
