॥ মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী ॥
নারীর প্রতি ক্রমবধর্মান সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সমাজের সভ্যতার মানদ- তার বিবেক, অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সুউচ্চ কোন অট্টালিকা নয় বরং সে সমাজে নারীরা কতটা নিরাপদ, সম্মানিত এবং স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারেন সেটিই তার সভ্যতার অন্যতম পরিচয়। অথচ আমাদের সমাজের সামনে আজ নারী বা কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা, সম্মান, মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ¯েœহ ও ভালবাসা নিয়ে এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ঘর-সংসারে হিংসা-বিদ্ধেষ, নির্যাতন, পণপ্রথা বা যৌতুক, এসিড হামলা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত নারীকে হেয় করার সংস্কৃতি আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের দেশে ৮৭ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে। কন্যা শিশু থেকে কিশোরী, বালিকা, ছাত্রী, গৃহকর্মী, শ্রমজীবি, পেশাজীবী নারীরা আজকাল ঘরের ভিতর-বাইরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, বাস, ট্রেন, লঞ্চ বা বিভিন্ন যানবাহনে, পথে-ঘাটে, বাজারে সকল ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, নির্যাতন, উত্ত্যক্তকরণ এমন কি হত্যার মত ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। যার নেতিবাচক প্রভাব সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নে পড়ছে যা দেখার কেউ নেই।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল রাস্তা-ঘাটে ঘটছে তা নয়। বহু কন্যা শিশু, বালিকা, তরুণী বা নারী মহিলাদের জন্য বাসা-বাড়িও সবসময় নিরাপদ নয়। ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয় এটি মানুষের নারীর শরীর, স্বাধীনতা ও মর্যদার ওপর নির্মম আক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন তরুণী নির্যাতনের শিকার হলে অনেকেই পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ঘটনা চাপা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। যেমন পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে, সমাজ কি বলবে, মেয়েটির বিয়ে হবে কি ইত্যাদি অথচ সম্মান রক্ষার নামে যদি একজন নারীর কন্ঠস্বরই স্তব্দ করে দেওয়া হয় তবে সে সম্মান আসলে কার? যে সমাজ একজন নির্যাতিত নারীর সম্মানের চেয়ে অপরাধীর সামাজিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়, সে সমাজকে নিজের মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এককভাবে পুলিশের নয় গোটা রাষ্ট্রের। দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ অবশ্যই অপরিহার্য। কেননা নারীর নিরাপত্তা কোন বিশেষ সুবিধা নয়, এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার। নিরাপত্তার নামে নারীদের স্বাধীনতা কোনভাবেই খর্ব করা ঠিক নয় বরং পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার কাঠামোকে প্রশ্ন করাই প্রকৃত সমাধানের পথ।
রাষ্ট্রের নিকট নারী ও কন্যা শিশুদের প্রশ্ন আর কত ধর্ষণ হবে এ সমাজে? প্রশ্ন হচ্ছে আর কতদিন আমরা ধর্ষণ বা নারী নর্যাতন নিপীড়নের ঘটনাসমূহকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখবো এবং তার পিছনে থাকা সামাজিক মানসিকতাকে উপেক্ষা করবো? কতদিন একজন নারীর কান্না সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে থাকবে, তারপর কয়েকদিনের মধ্যেই জনস্মৃতি থেকে মুছে যাবে? বাংলাদেশের মত একটি গরীব ও দরিদ্র দেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বাল্য বিবাহ এবং যৌন হয়রানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মনমালিন্য লেগেই থাকে। দরিদ্র পরিবারের বিবাহিত কন্যা বা মেয়েদের জীবনে দিন দিন বহু বিবাহ এবং বিচ্ছেদের ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। বলে রাখা ভাল, একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার নারীদেরকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য প্রতিনিয়ত সতর্ক হয়ে বাঁচতে হয় না। তাই আজ প্রয়োজন শুধু প্রতিবাদ নয়, সামাজিক পুনর্গঠন, শুধু কঠোর আইন নয়, কঠোর নৈতিক অবস্থান, শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদি লড়াই-সংগ্রাম। কারণ নারীর মর্যাদা রক্ষা কোন নারী-সংক্রান্ত বিষয় নয় এটি সমগ্র সমাজের মানবিকতার পরীক্ষা। আজকাল অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারে কিশোরী-তরুণী ও মহিলাদের মাঝে বিষণœতা, ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে অনেকে হয়তো লাইক বা প্রশংসার মোহে বাস্তব জীবনের আনন্দ-অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। এতে শিক্ষার্থী বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা বা কাজের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফেসবুক-ম্যসেঞ্জার সাধারণত ভালোর থেকে অনেক সময় বিপদও ডেকে আনে। আজকাল ছেলে-মেয়েরা সকলেই ফেসবুকে আসক্ত হয়ে পরেছে। আর পরবেই না কেন স্মার্ট ফোন সাধারণত যার মাধ্যমে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। তরুণী বা মহিলারা সকলেই এখন ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল। ঘরের বউ কেন স্বামী-স্ত্রী সকলকেই ফেসবুক নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে দেখা যায়, এমনকি কিশোরী ও বালিকা মেয়ে গৃহবধূরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল নিয়ে টিকটক করে। বিশেষজ্ঞদের মতে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার তথা স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে যে হারে প্রতারণা, মিথ্যা-ছলনা,ছল-চাতুরী বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে মেয়েদের মধ্যে ডির্ভোস শুধু নয়, তাদেরকে দেশ বিদেশে পাচার-বিক্রি করার মত বিপথে যেতে বাধ্য করা হয়।
সমাজ ও পরিবারগুলোতে নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যে কোন অবস্থায় নারী ও কন্যা শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নসহ সকল প্রকার সহিংসতা দূর করার মাধ্যমে নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান গড়ে তোলার জন্য সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
