Published on
:
2 min read
হিন্দুধর্মে দেবী লক্ষ্মী সম্পদ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া, শান্তিপ্রিয়া। অশান্তি, কলহ, বড়দের অসম্মান, অহঙ্কার একদম সইতে পারেন না। তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করেন তাই তো তিনি চঞ্চলাও। দেবীর প্রচলিত যে রূপের হদিশ পাওয়া যায়, সেখানে তিনি পদ্মাসনে বিরাজমান। এক হাতে পদ্মফুল বা ধানের শিষ অন্য হাতে ঝাঁপি। পদ্ম তাঁর ভীষণ প্রিয়, তাই তো তিনি কমলা। তবে এই রূপ কেবল বাংলাতেই পূজিত হয়। অন্যত্র দেবী চতুর্ভুজা। এমনকী গুগল সার্চ করলেও, তাঁর সেই চতুর্ভুজা রূপের বেশি ছবি পাওয়া যায়। দুই হাতে পদ্ম। অন্য দুই হাতে বরাভয় বা অন্যান্য প্রতীক ধারণ করে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু বাংলার ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় যে দেবীমূর্তির আরাধনা করা হয়, তাঁর সাধারণত দুটি হাত। শাস্ত্র ও পুরাণেও চতুর্ভুজা লক্ষ্মীর উল্লেখ রয়েছে। তা হলে চতুর্ভুর্জা দেবী বাংলায় এসে দ্বিভুজা হয়ে গেলেন কী ভাবে? সত্যিই কি তা শাস্ত্র বিরুদ্ধ?
না, দেবীকে লক্ষ্মীকে বাংলার বাইরে মূলত চতুর্ভুজা রূপে কল্পনা করা হলেও দ্বিভুজা রূপ একেবারে কল্পনা প্রবণ এমন নয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দ্বিভুজা রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে দ্বিভুজা ও চতুর্ভুজা— দুই রূপেরই উল্লেখ রয়েছে। এই পুরাণের তৃতীয় খণ্ডের ৮২ অধ্যায়ে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তির বর্ণনায় দেখা যায়, বিষ্ণুধর্মোত্তরের নির্দেশ অনুযায়ী দেবীকে সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দুই হাতেও দেখানো যেতে পারে। আবার স্বতন্ত্র মূর্তিতে তাঁকে চার হাতেও কল্পনা করা হয়েছে। চতুর্ভুজা রূপে পদ্ম, পূর্ণঘট, শঙ্খ থাকে তাঁর হাতে।
অগ্নিপুরাণেও দেবীর চতুর্ভুজা রূপের বর্ণনা রয়েছে। অগ্নিপুরাণের ৩০৮ অধ্যায়ে শ্রীদেবীকে চার হাতবিশিষ্ট রূপে ধ্যান করার কথা বলা হয়েছে। তাঁর দুই হাতে পদ্ম এবং অন্য দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা বা অন্যান্য প্রতীক থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে দ্বিভুজা লক্ষ্মীর রূপ কোনও শাস্ত্রবিরুদ্ধ কল্পনা নয়। প্রাচীন ভারতীয় মূর্তিতত্ত্বে দেবী লক্ষ্মীর একাধিক রূপের উল্লেখ রয়েছে। বিষ্ণুর সঙ্গে অবস্থানকালে তাঁকে দ্বিভুজা হিসেবে দেখানোর রীতিও রয়েছে। ফলে দেবীর হাতের সংখ্যা অঞ্চল, উপাসনার ধরন এবং মূর্তিকল্পের উপর নির্ভর করে বদলেছে।
বাংলায় কী ভাবে প্রাধান্য পেল দেবীর দ্বিভুজা রূপ?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিতে। বাঙালি চিরকাল বড় স্নেহপ্রবণ। তাই তো সিংহবাহিনী পরম পরাক্রমী আদ্যাশক্তি এই বাংলায় হয়ে যান ঘরের মেয়ে উমা। শরতের দুর্গাপুজো যতটা সেই শক্তির উপাসনা তার চেয়ে অনেক বেশি ঘরের মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরা। এই ভাবনা থেকেই দশমীর দিন বিদায় বিলায় রয়েছে কনকাঞ্জলি দেওয়ার প্রথা। ঠিক যেমন করে বিয়ের পরে কনকাঞ্জলি দিয়ে শ্বশুর বাড়ি যায় মেয়ে, তেমনই কনকাঞ্জলি দেওয়া হয় দেবীর। সধবা মহিলারা সেই কনকাঞ্জলি রেখে দেন নিজ গৃহে। সেই ঘরের মেয়ে করে তুলতে গিয়ে দেবী লক্ষ্মীও দ্বিভুজা হয়ে গিয়েছেন এই বঙ্গে।
লেখক তমোঘ্ন নস্কর বলেন, ‘দেবী কে আমদের কাছে ঘরের মেয়ে। আমাদের আপনজন করতে গিয়ে, মায়ের মেয়ে করতে গিয়ে একবারে একান্ত যাপনে আমরা দ্বিভুজা করে তুলেছি। তবে এই বাংলাতেও স্থানে গজলক্ষ্মীর আরাধনাও হয়। সেই গজলক্ষ্মী কিন্তু আবার দ্বিভুজা নন, চতুর্ভুজা।’
বাংলায় লক্ষ্মীকে ঘরের মেয়ে, ধন-ধান্য ও গৃহস্থের মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়। সেটাই বাংলার ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে।
