বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ও সার্কুলার অর্থনীতিকেও একইভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। নগর বর্জ্যকে শুধু অপসারণের সমস্যা হিসেবে না দেখে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন একটি গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা ইত্যাদি দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এগুলোর ধরনের বড় পরিবর্তন এসেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের জমি ও পানিতে ক্রমেই লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। তাপপ্রবাহ বেড়েছে। এগুলো জনজীবন ও পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদন ও স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে। সুতরাং বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ যেমন জরুরি, অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাসও প্রয়োজন। আর সেটি হতে হবে সুবজ অর্থনীতির দিকে যাত্রা। কারণ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় অর্থ ব্যয় করে অন্যদিকে জ্বালানি ও সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, দূষণ ও অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে নতুন ঝুঁকি তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তবে এ রূপান্তর সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ দেশের অর্থনীতির বড় অংশ রয়েছে বেসরকারি খাতে। কোথায় বিনিয়োগ হবে, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার হবে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া কীভাবে বদলাবে, তার বড় অংশীজন বেসরকারি খাত। তাই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেই সবুজ অর্থনীতির দিকে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সবুজ অর্থনীতির জন্য প্রথমেই বিনিয়োগ পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক, সেতু, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা আবাসন প্রকল্প কোথায় ও কীভাবে নির্মিত হবে, তা নির্ধারণের আগে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন করা দরকার। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে এটি হলে ভবিষ্যৎ ক্ষতি ও পুনর্নির্মাণের ব্যয় কমবে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-৫০ ও ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের সঙ্গে বাজেট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর সমন্বয় জরুরি, যেখানে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা ও বেসরকারি বিনিয়োগও যুক্ত থাকবে।
জ্বালানি খাত সবুজ রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহের ওঠানামা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো একই সঙ্গে পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়। শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, নিজস্ব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগে বেসরকারি খাতের ভূমিকা সবচেয়ে বড় হতে পারে। তবে জমির সীমাবদ্ধতা, গ্রিড সংযোগ, অর্থায়নের বাধা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর না করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে। এনডিসি ৩.০-তে ২০৩৫ সালের মধ্যে ব্যবসা স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর যে লক্ষ্য রয়েছে, তা অর্জনেও এ খাতের অংশগ্রহণ জরুরি।
শিল্প খাতেও সবুজ প্রযুক্তির প্রসার প্রয়োজন। জ্বালানি ও পানির দক্ষ ব্যবহার, বয়লার, মোটর ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বর্জ্য পানি পরিশোধন, পুনর্ব্যবহার এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অপচয় কমানো পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয়ও কমাতে পারে। বাংলাদেশের রফতানিমুখী পোশাক ও বস্ত্র শিল্পে এ বিষয়টির গুরুত্ব আরো বেশি, কারণ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবেশগত মান ও নিঃসরণ-সংক্রান্ত তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। আইএফসির তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে বছরে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, যার একটি অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ও সার্কুলার অর্থনীতিকেও একইভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। নগর বর্জ্যকে শুধু অপসারণের সমস্যা হিসেবে না দেখে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্লাস্টিক, ধাতু, কাগজ ও জৈব বর্জ্যের পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ বাড়ালে পরিবেশদূষণ কমার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। তবে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করলে সবুজ রূপান্তরের ব্যয় তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এছাড়া বন সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য নির্গমন হ্রাসের নির্ভরযোগ্য পরিমাপ, স্বাধীন যাচাই ও স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্যারিস চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের আওতায় অনুমোদন ও যথাযথ হিসাবরক্ষণের নিয়মও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যবস্থা দুর্বল হলে কার্বন ক্রেডিটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বাজারমূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাব্য আয়কে নিশ্চিত রাজস্ব হিসেবে না দেখে জলবায়ু অর্থায়নের অতিরিক্ত উৎস হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত, সরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অনুদানের বিকল্প হিসেবে নয়।
তবে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জলবায়ু কার্যক্রমে মাঝারি মেয়াদে অতিরিক্ত ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনের কথা বলেছে। এ চাহিদা মেটাতে কেবল সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করা কঠিন। সরকারি অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, সবুজ ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে কোন প্রকল্পকে সবুজ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তার স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে করনীতি, জ্বালানি, আমদানি শুল্ক ও পরিবেশগত বিধিবিধানে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে নীতির সমন্বয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর সহজ হয়ে আসবে।
