জমিদারি নেই। নেই অতীতের সেই জৌলুস। তবু বদলায়নি প্রথা। কোজাগরী পূর্ণিমায় একই বেদিতে পাশাপাশি পূজিত হন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। শান্তিনিকেতনের তালতোড়ের ঘোষ জমিদারবাড়িতে আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এভাবেই বেঁচে রয়েছে ঐতিহ্য। এখানে লক্ষ্মী একা নন, একই বেদিতে, একই আসনে তাঁর পাশে বিরাজ করেন বিদ্যার দেবী সরস্বতীও। দুই বোনের যুগল আরাধনায় মেতে ওঠে তালতোড়ের ঘোষ জমিদারবাড়ি।
জানা যায়, শান্তিনিকেতনের তালতোড়ের ঘোষ জমিদার পরিবারের লোটন ঘোষের স্ত্রী স্বর্ণময়ী দেবী এক সময়ে মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। তারপরেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেই পুজোর মণ্ডপেই পরবর্তীকালে সাড়ম্বরে শুরু হয় লক্ষ্মী ও সরস্বতীর আরাধনা। বংশপরম্পরায় সেই পুজো আজও চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যেরা। সাবেকিয়ানা, পুজোয় পরম্পরা তালতোড়ের ঘোষবাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ সাবেকি প্রতিমা। বছরের পর বছর ধরে প্রতিমার গড়ন ও রূপে কোনও পরিবর্তন হয়নি। পাঁচ প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা গড়ে আসছেন। প্রতিমার মুখও তৈরি হয় হাতে। কোনও ছাঁচের সাহায্য নেওয়া হয় না।
পুরনো ঠাকুরদালানের স্থাপত্যেও ধরা পড়ে বনেদিয়ানার ছাপ। সযত্নে রক্ষিত সেই দালান আজও টানে দর্শনার্থীদের। এক সময়ে যে বাড়ি জমিদারি আভিজাত্যের প্রতীক ছিল, আজও তার পুজো ঘিরে এলাকার মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। পুজোর রীতিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। কোপাই নদী থেকে দুই দেবীর জন্য পৃথক দু’টি ঘট আনা হয়। বৈষ্ণব মতে পুজো হয় দুই দেবীর। সারা বছর বাড়িতে লক্ষ্মী-জনার্দন নারায়ণের আরাধনা চলে। তাই পুজোয় অন্নভোগের পরিবর্তে নিবেদন করা হয় চিঁড়ে, নাড়ু, ফল, মিষ্টি-সহ নানা উপকরণ। জমিদারি নেই, আগের মতো আর্থিক প্রতিপত্তিও নেই।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, এক সময়ে খাতায়-কলমে থাকা বিপুল পরিমাণ জমির অনেকটাই বেহাত হয়েছে, কোথাও আবার সম্পত্তি বেদখল হয়েছে। দুর্গার নামে থাকা সম্পত্তিরও বড় অংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু থেমে যায়নি পুজো। পরিবারের সদস্য শুভাশিস ঘোষ ও বিশ্বরূপ ঘোষ বলেন, “এক সময়ে জমিদারি আমলে পুজোয় প্রচুর জাঁকজমক হত। আরতির সময় বড় বড় পাখা ব্যবহার করা হত। আশপাশের বহু গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ পুজো দেখতে আসতেন। সকলের জন্য ভোগের আয়োজন থাকত। আর্থিক সঙ্গতি কমলেও আজও সেই রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করি। লক্ষ্মী ও সরস্বতী একে অপরের পরিপূরক। জমিদারি আমলে যে প্রথা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলে আসছে।” নানান প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই পরিবারের সদস্যেরা বয়ে চলেছেন আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য। আসলে, এই পুজো শুধু দুই দেবীর আরাধনা নয়, এ-এক শিকড়ের টান, উত্তরাধিকারের অঙ্গীকার। তাই জমিদারি না থাকলেও কোজাগরীর রাতে তালতোড়ের ঘোষবাড়িতে আজও প্রজ্বলিত হয় ঐতিহ্যের প্রদীপ। সময় বদলেছে, বদলায়নি বিশ্বাস। জৌলুস হারিয়েছে, হারায়নি পরম্পরা।
