দ্বীনি জ্ঞানের গভীরতা আর আধুনিক জ্ঞানে দক্ষতা–দুই ধারাকে এক সুতোয় গেঁথে কওমি অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত গড়েছেন লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ। ঢাকার মাতুয়াইলে তার প্রতিষ্ঠিত জামিয়া কাশিফুল উলূমে শিক্ষার্থীরা শুধু কোরআন-হাদিস ও ফিকহের পাঠ নেয় না, শেখে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাস্তবমুখী নানা বিদ্যাও। ভিন্নধর্মী এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে দ্বীনপ্রিয় মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিষ্ঠানের আদ্যোপান্ত ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুফতি উমর ফারুক আশিকী
জামিয়া কাশিফুল উলূম প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: জামিয়া কাশিফুল উলূম প্রতিষ্ঠার পেছনে আমার মূল চিন্তা ছিল–আমাদের সন্তানরা এমনভাবে গড়ে উঠবে–যেন তারা একদিকে কোরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করে, অন্যদিকে সমকালীন পৃথিবীকে বোঝার মতো জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করে। তারা যেন দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ হাসিল করতে পারে।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন ও অন্যান্য জ্ঞানশাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই বিস্তৃত ঐতিহ্য আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও পলিটেকনিক পাঠ্যক্রমের সমন্বয় করেছি।
আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা কোরআন-হাদিস পড়বে, তাহাজ্জুদ আদায় করবে, সুন্নাহ অনুসরণ করবে; আবার বিজ্ঞানাগারে গবেষণা করবে, কম্পিউটারে কাজ শিখবে, প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তা করবে এবং উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জন করবে। আমি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা সংস্কার ও কারিকুলাম নিয়ে কাজ করে আসছি। জামিয়া কাশিফুল উলূম ঢাকা মূলত সেই গবেষণা-ভাবনার ফসল।
এই প্রতিষ্ঠান অন্যদের থেকে আলাদা কী কারণে?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: এটি বাংলাদেশের প্রথম কোনো কওমি মাদ্রাসা, যা শতভাগ সমন্বিত শিক্ষা সিলেবাসে পরিকল্পিতভাবে সাজানো। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও কারিগরি পাঠ্যক্রমের সমন্বিত পূর্ণাঙ্গ আর কোনো পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। আরবি ভাষা চর্চার পাশাপাশি ইংরেজি শেখার ব্যবস্থাও রয়েছে। দরসি পাঠ্য রুটিন অনুসরণ করার পাশাপাশি গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে এ প্রতিষ্ঠানে নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ, আমল-আখলাক ও দাওয়াহর চর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা—যেখানে আধুনিক হওয়ার জন্য ধর্মীয় পরিচয় বিসর্জন দিতে হবে না, আবার ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকেও দূরে থাকতে হবে না।
শিক্ষার্থীরা কি শুধু বই পড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখে, নাকি হাতে-কলমে কাজ করারও সুযোগ রয়েছে?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার বাস্তব প্রয়োগ শেখা কঠিন। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের প্রতিষ্ঠানে সায়েন্স ও কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস সিস্টেমসহ আধুনিক প্রযুক্তির অন্যান্য ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হবে না; বরং তারা প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তা করবে, সমস্যার সমাধান করবে এবং নিজেদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশ ঘটাবে।
সমন্বিত পড়াশোনার কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় না?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দুটি ধারার শিক্ষাকে একসঙ্গে পরিচালনা করতে গেলে সময়, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থীর সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। শুধু বিষয় বাড়িয়ে দিলেই ভালো শিক্ষা নিশ্চিত হয় না; বরং কোন বিষয় কতটা প্রয়োজন, কীভাবে পড়ানো হচ্ছে এবং শিক্ষার্থী কতটা শিখতে পারছে–এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দ্বীনি শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে সাধারণ ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করেছি। শিক্ষার্থীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সময়ের হেফাজত ও সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এ চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করছি, আলহামদুলিল্লাহ।
অন্যান্য কওমি মাদ্রাসাও যদি এ ধরনের সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চায়–তাদের জন্য পরামর্শ কী?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: প্রথমেই আমি চাই–এই চিন্তাটি একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। তবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে তার নিজস্ব বাস্তবতা, সামর্থ্য ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একসঙ্গে সবকিছু চালু করার চেয়ে ধাপে ধাপে এগোনো বেশি বাস্তবসম্মত।
প্রথম পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও কম্পিউটারের মৌলিক দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞান শিক্ষা, ভাষাচর্চা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। আরেকটি বিষয় হলো, দ্বীনি শিক্ষার স্বকীয়তা ও মান শতভাগ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। আধুনিক শিক্ষার নামে মূল দ্বীনি শিক্ষাধারাকে দুর্বল করা যেমন উচিত নয়, তেমনি প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা যুক্ত করাও অযৌক্তিক হবে।
এই মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থীকে সমাজে কী ভূমিকায় দেখতে চান?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: আমি চাই, একজন শিক্ষার্থী প্রথমত ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল মুমিন-মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠুক। ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক। তার মধ্যে যেন ইলম, আমল, নৈতিকতা, মানবিকতা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা থাকে। এরপর সে নিজের যোগ্যতা, আগ্রহ ও অর্জিত দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে।
কেউ হতে পারে মুহাদ্দিস, মুফতি বা ইসলামি গবেষক; আবার কেউ হতে পারে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ বা উদ্যোক্তা, ব্যাংকার ও করপোরেট ব্যবসায়ী। আবার কেউ গবেষণা করতে পারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে। কেউ সমাজসেবা বা দাওয়াহর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। কেউ কাজ করতে পারে মিডিয়া ও গণমাধ্যমে। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নেতৃত্ব দিতে পারে কেউ। আমি বিশ্বাস করি–যতক্ষণ পর্যন্ত আহলে ইলমরা মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি সমাজের মূলধারায় নেতৃত্ব না দেবেন, ততদিন সমাজের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আপনার শিক্ষা-দর্শনের মূল লক্ষ্য কী?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: আমার শিক্ষা-দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো–দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ। দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিক চরিত্র, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা। আমার স্বপ্ন এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা–যারা দ্বীনি জ্ঞানে গভীর, চরিত্রে সুন্দর, চিন্তায় সৃজনশীল এবং কাজে-প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে। তারা আলেমও হতে পারবে, বিজ্ঞানীও হতে পারবে; হতে পারবে গবেষক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা কিংবা প্রযুক্তিবিদ।
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য কী?
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ: জামিয়া কাশিফুল উলূমকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি। আমরা বাংলাদেশকে কেবল যোগ্য নাগরিক উপহার দিতে চাই না, বরং উম্মাহর নেতৃত্বদানকারী আলেম তৈরি করতে চাই। ইতোমধ্যে আমাদের কাছে অধ্যয়ন করে অনেকে হাফেজ আলেম হয়ে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত ও বৃহৎ পরিসরে বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ কম্পিউটার ল্যাব, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণামুখী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে চাই।
কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস সিস্টেমের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগও আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনার অংশ। আমরা প্রথম কওমি বিজ্ঞান মেলার জন্য বিজ্ঞান প্রজেক্টের কাজ শুরু করেছি। আমাদের স্বপ্ন শুধু একটি বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়; বরং মনোরম ও যথার্থ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা–যার অভিজ্ঞতা আলোকিত করবে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও।
