*৫ ধাপে ৩ কোটি ১৮ লাখ ২৩,১৪৪ টাকা*
*অর্থ ব্যবহারে নতুন নীতি এখনই কার্যকর নয়- জেলা প্রশাসক*
স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও ডেগে ভক্তদের দেওয়া অর্থের পঞ্চম দফার গণনায় পাওয়া গেছে প্রায় ৮৯ লাখ টাকা। দেশি মুদ্রার পাশাপাশি এবারও বিভিন্ন দেশের বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণ ও রুপা পাওয়া গেছে। ৩৪ দিন পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টায় প্রকাশ্যে এ গণনা শুরু হয়। এতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, মাজার ব্যবস্থাপনায় গঠিত কমিটির প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে গণনা শুরুর সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মাজারের দানের অর্থ ব্যবহারের নতুন সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর হচ্ছে না। আপাতত গণনা শেষে সব টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। সেখান থেকে বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল ও আনসার সদস্যদের বেতন পরিশোধ করা হবে। মাজারের ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পর দানের অর্থ ব্যবহারের নতুন নীতি কার্যকর করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মাজারের জন্য একজন ব্যবস্থাপক, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও প্রায় এক মাস লাগতে পারে। এরপর প্রতিদিন দানের টাকা গণনার ব্যবস্থা করা হবে। এর আগে বর্তমান ব্যবস্থাপনায় আরও একবার গণনা হতে পারে।
জানা গেছে, এবার মাজারের তিনটি ডেগ ও পাঁচটি দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ গণনা করা হয়। এছাড়া পাওয়া গেছে ১ ভরি সাড়ে ৮ আনা স্বর্ণ, ৩ ভরি ১৩ আনা রূপা এবং ১৮ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা। এসব মুদ্রার মধ্যে রয়েছে ১৪ পাউন্ড, ৭ হাজার ৬৪৭ ভারতীয় রুপি, ২০ থাই বাত, ৯৩ সৌদি রিয়াল, ১১ মালয়েশীয় রিঙ্গিত, ২৯ মার্কিন ডলার, ১ হাজার ৩৫০.৫০ ওমানি বায়সা, ৬৫ আমিরাতি দিরহাম, ১৫ মালদ্বীপের রুপি, ১৭ কাতারি রিয়াল, ৭ ইউরো ৩৩ সেন্ট, ১০০ বাহরাইনি পয়সা, ১০ হংকং ডলার, ১ ব্রুনাই ডলার, ৫৫ নেপালি রুপি, ১০০ পাকিস্তানি রুপি, ৫০ রুশ রুবল ও ৫০০ শ্রীলঙ্কান রুপি।
প্রাপ্ত স্বর্ণ, রূপা ও বৈদেশিক মুদ্রার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৩৮ টাকা। এই মূল্য নগদে পাওয়া ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকার অতিরিক্ত।
৫ ধাপে মোট নগদ মিলেছে ৩ কোটি ১৮ লাখ ২৩ হাজার ১৪৪ টাকা। স্বর্ণ-রূপা ও বিদেশী মুদ্রার টাকার হিসেব এখানে আসেনি।
চার দফায় জমা ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা :
জানা গেছে, এর আগে গত ২২ জুন প্রথম দফায় প্রকাশ্যে গণনায় পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক যুক্ত হওয়ায় মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় গণনায় পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা।
সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দফার গণনায় দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। ওই দফায় নগদ অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, স্বর্ণ ও রুপা পাওয়া যায়। চার দফায় মোট ২ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা পাওয়া গিয়েছিল।
পঞ্চম দফায় পাওয়া প্রায় ৮৯ লাখ টাকা যোগ হলে দানবাক্স ও ডেগ থেকে গণনায় পাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ আরও বাড়বে। তবে এ দফার চূড়ান্ত হিসাব এবং আগের চার দফার সঙ্গে সমন্বয়ের পর মোট অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো :
মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এক সভায় দানের অর্থ ব্যবহারের নতুন নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দানের অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজে ব্যবহারের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ দিয়ে মাজারের দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উন্নয়ন তহবিলের ব্যাংক হিসাব জেলা প্রশাসক ও মাজারের মোতোয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা। অর্থ গণনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একজন ব্যবস্থাপক, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। তবে সর্বশেষ ঘোষণায় কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ফলে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন ব্যবস্থাপনা কার্যকর হবে।
মাজারের সার্বিক পরিচালনা, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকির জন্য ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসক এ কমিটির আহ্বায়ক থাকবেন। কমিটিতে সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ, সিলেট জেলা পরিষদ ও পুলিশ সুপারের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। মাজারের মোতোয়াল্লি সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন।
বিতর্কের পর প্রকাশ্যে গণনা :
মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের পর চলতি বছরের ২৩ জুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগে ১৮ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগে মাজারের পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একইসঙ্গে দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি ডেগও সিলগালা করা হয়েছিল। এ পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর প্রেক্ষিতে ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন তাঁর উপস্থিতিতে দানবাক্সের তালা খুলে জনসমক্ষে টাকা গণনা করা হয়। এরপর থেকে নির্দিষ্ট বিরতিতে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার মাধ্যমে দানের হিসাব সামনে আনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নিয়মিত গণনা, ব্যাংক হিসাবে অর্থ সংরক্ষণ এবং নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকর হলে মাজারের দানের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। তবে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে আপাতত আগের ব্যবস্থাতেই অর্থ সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো হবে।
