রাজশাহীর তানোরে আমন ধানে সাতরা পোকার আক্রমণে ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। শুধু পাতা হলুদই নয়, যেসব জমিতে এ পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে, সেসব জমিতে ধানগাছের অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ধানগাছের পাতা রক্ষা করতে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেও পোকা দমন করতে পারেননি কৃষকেরা। আক্রান্ত জমিতে অর্ধেক ফলনও হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণে কৃষি অফিস থেকে সঠিক পরামর্শ পাননি কৃষকেরা। ফলে রোগের প্রকোপ কমেনি; বরং ধীরে ধীরে পুরো জমির ধানগাছ পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। কৃষি অফিসের উদাসীনতার কারণেই এ সমস্যা দূর করতে পারেননি বলে অভিযোগ কৃষকদের।
কলমা ইউনিয়নের বিল্লি এলাকার কৃষক আবুল বলেন, তিনি ৫ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান লাগিয়েছেন। প্রায় পুরো জমিতেই এ রোগের প্রভাব পড়েছে। তবে এর মধ্যে এক বিঘা জমিতে রোগটির প্রকোপ বেশি। পচন ও কারেন্ট পোকার জন্য ব্যবহৃত কীটনাশক দিয়েও কোনো সুফল পাননি। এখন পর্যন্ত কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকেও জমিতে দেখা যায়নি। এ কারণে রোগের প্রকোপ কমেনি। এক বিঘা জমিতে বিভিন্ন খাতে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
যশপুর গ্রামের কৃষক সাহেব আলী বলেন, প্রায় সব জমিতেই এ রোগের প্রভাব দেখা দিয়েছে। তার ২ বিঘা জমিতে এ রোগ হয়েছে। প্রথম দিকে তার ধারণা হয়েছিল, কারেন্ট পোকা কিংবা পচন রোগের কারণে ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। শুধু তার জমিতেই নয়, তার বড় ভাইয়ের দেড় বিঘা, তসলিমের এক বিঘা এবং হাবিলের ১৫ কাঠা জমিতেও এ রোগ দেখা দিয়েছে। এ ধরনের রোগ আগে কখনো দেখা যায়নি। তাই তারা কারেন্ট পোকা ও পচন রোগের জন্য ব্যবহৃত কীটনাশক প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু রোগ দূর হওয়ার পরিবর্তে প্রতিদিনই ধানগাছের পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। এখন ধানগাছ বসে গেছে, ফলে ফলন হবে না।
পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদের প্রাণপুর পাঠাকাটা গ্রামের কৃষক জাইদুর বলেন, প্রথম দিকে অল্প পরিমাণ ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়। তিনি ২০ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান লাগিয়েছেন। এর মধ্যে এক বিঘা জমিতে এ রোগ দেখা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, জাহাঙ্গীরের ২ বিঘা, এরবানের ৭ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে এরবানের দেড় বিঘা জমিতে এ রোগের আক্রমণ হয়েছে। রফিকের ১৪ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘায় এবং আইনুলের ৭ বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘায় এ রোগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের ধারণা, এ বছরই প্রথম এ ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে। এ কারণে তারা বুঝতে পারেননি কীভাবে রোগটি দূর করতে হবে। অনেকে বালাইনাশকের দোকানিদের পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগ করলেও কোনো ফল পাননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, তানোর থেকে মুন্ডুমালা পর্যন্ত বিভিন্ন জমিতে এ রোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। জমির বিভিন্ন স্থানে ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে গেছে এবং গাছ বসে পড়েছে। আবার অনেক জমির চারপাশের ধানগাছের পাতা হলুদ ও লালচে হয়ে আছে। যেসব স্থানে রোগের আক্রমণ হয়েছে, সেসব জায়গায় ধানের শিষ গজাবে না বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। কারণ, ধানগাছ ধীরে ধীরে বসে গেছে এবং তা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। এ কারণে হতাশ হয়ে রোগ দমন করতে না পেরে ফলনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক কৃষক।
লতিফ নামের এক কৃষক বলেন, প্রচণ্ড খরার কারণে এ রোগের আবির্ভাব হয়েছে। তারা কখনোই মাঠে কৃষি অফিসের লোকজনকে দেখেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা পা ফাটা, লুঙ্গি পরা কৃষক। সারা দিন মাঠে কাজ করি। কৃষি দপ্তরের কাজই হলো মাঠে থাকা। কিন্তু তারা তো মাঠেই আসে না।’
কৃষকেরা আরও বলেন, এবার রোপা আমন ধান রোপণের সময় এবং এর পর থেকে জমিগুলো প্রচণ্ড খরতাপের কবলে পড়ে। সেচের পানি দিয়ে কোনোরকমে ধানগাছ বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। খরার কারণে প্রচুর আগাছার জন্ম হয়েছে। এক বিঘা জমির আগাছা পরিষ্কার করতে কমপক্ষে ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। সাধারণত রহমতের বৃষ্টির পানিতে রোপা আমন ধানের চাষ হয়। এ কারণে অন্যান্য ফসলের তুলনায় এতে খরচও কম হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সেচের পানি দিয়ে ধান রোপণ করতে হয়েছে এবং রোপণের পর কয়েকবার বিভিন্নভাবে সেচ দিতে হয়েছে। এ ছাড়া কীটনাশক ও সারের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে অন্য বছরের তুলনায় দ্বিগুণ খরচ করতে হয়েছে কৃষকদের। কিন্তু সাতরা পোকার আক্রমণের কারণে এবার ফলনে চরম বিপর্যয় ঘটবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ধানগাছের বয়স আড়াই থেকে তিন মাস। এখন পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
আদর্শ কৃষক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রচণ্ড খরতাপের কারণে এ রোগের সৃষ্টি হয়েছে। সাতরা পোকার আক্রমণে ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে গাছ বসে গেছে। জমির যেসব স্থানে এ রোগের আক্রমণ হয়েছে, সেসব স্থানে ফলন হবে না। বিশেষ করে উঁচু জমিতে এ রোগের আক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তার মতে, রোগের আক্রমণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত স্থানের ধানগাছ তুলে নতুন ধানগাছ রোপণ করা হলে ফলন পাওয়া যেত।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, জিংক বা কৃমির কারণে এ ধরনের রোগ হতে পারে। তবে জমিতে না গিয়ে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। তিনি এ রোগ সম্পর্কে অবগত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অজানা নয় এবং কিছু কিছু জায়গায় তিনি গিয়েছেন। এভাবেই নিজের দায়িত্ব সেরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তিনি প্রতিদিন শহর থেকে অফিস করেন। অথচ সব সময় কৃষকদের পাশে থাকার জন্য সরকার থেকে গাড়ি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠকর্মী থাকলেও কৃষকদের জমিতে তাদের দেখা মেলে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার ৩২০ হেক্টর। তবে এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে।
