জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রণীত ন্যায়পাল আইন কার্যকর না করার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ; একই সঙ্গে তিনি সনদ বাস্তবায়নে সংস্কারপন্থী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পাশাপাশি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রণীত ন্যায়পাল আইনও কার্যকর করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। তিনি বলেন, শুধু সংবিধান বা জুলাই সনদ নয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পিতার প্রণীত আইনকেও অবহেলা করছেন।
শনিবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে জেডিপি আয়োজিত ‘জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে’ মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন।
নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। তবে বিএনপি সরকার এ সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবে, এমন কোনো সম্ভাবনা আর নেই। এ জন্য জেডিপি ও সমমনা সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতায় আসতে হবে। একই সঙ্গে এখনই ‘সর্বদলীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে ধাপে ধাপে প্রতারণা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—অর্থাৎ বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল—জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই বিএনপি অমান্য করছে। অন্যদিকে, জামায়াত কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করে সেগুলো মেনে নিচ্ছে।
জুলাই সনদের ২৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা উল্লেখ করে নাঈম আহমাদ বলেন, ‘অলংকার’ কিংবা ‘অনুগ্রহের পদ’ বিবেচনা করে জামায়াত সেই পদ গ্রহণ করেনি। অথচ সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রধানের পদটি তারা গ্রহণ করেছে। সনদের ২৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংসদের চারটি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার কথা থাকলেও জামায়াত চারটির পরিবর্তে মাত্র একটি পদ পেয়েই নীরব রয়েছে। বাকি তিনটি পদে বিএনপি নিয়োগ দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদের ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নাটকীয়তা দেখা গেছে। এসব ঘটনাকে সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ প্রতারণা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ন্যায়পাল আইন প্রসঙ্গে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, জুলাই সনদের ৩৯ নম্বর ধারায় ন্যায়পাল নিয়োগের কথা রয়েছে। বর্তমান সংবিধানেও ন্যায়পালের বিধান রয়েছে। এমনকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালের ৯ এপ্রিল ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০ প্রণীত হয়। কিন্তু তাঁর সন্তান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই আইনও এখনো কার্যকর করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে বিএনপিকে বেশ কিছু ‘অসুবিধায়’ পড়তে হবে উল্লেখ করে নাঈম আহমাদ বলেন, সনদের ১৬ নম্বর ধারা মানলে বিএনপি নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে পারবে না। ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচনে ৩৩ শতাংশ নারীকে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দিতে হবে। ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে হবে। ফলে নিজেদের ইচ্ছামতো বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সনদের ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে আদালতপাড়ায় দলীয় আইনজীবীদের অপরাজনীতির সুযোগ সীমিত হবে। ৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভোট কারচুপি ও জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। আর ৬৯ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে পুলিশকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; বরং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে হবে।
নাঈম আহমাদ বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদের ৭৫ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতিবাজদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হবে। তখন বিএনপির অনেক আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো অবস্থা থাকবে না। ফলে মুখে যা-ই বলুক, বিএনপির পক্ষে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেডিপি জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংস্কারের পক্ষে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। একই সঙ্গে এখন থেকেই ৩০০টি সংসদীয় আসনে বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমন্বিত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির রূপরেখা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।
জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহতাব হোসেন সাব্বিরের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন দলটির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ, জনতার দলের যুগ্ম মহাসচিব স্বনাম ফুয়াদ, জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ইয়াসিন আরাফাত রাজ এবং জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ প্রমুখ।
