পুরী, মন্দারমণি, চাঁদিপুর, দার্জিলিং, হিমাচল, কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ— পুজোভ্রমণের তালিকাটি বেশ লম্বা। তবে স্বল্পচেনা ঠিকানাই বা দুর্গাপুজোর সফরে ঠাঁই পাবে না কেন? দিন ৫-৬ ছুটি পেলে সকালবেলাই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। গন্তব্য ছত্তীসগঢ়ের মৈনপাট। ছোট্ট জনপদটি ‘মিনি তিব্বত’ নামেও পরিচিত। শোনা যায়, চিন কর্তৃক তিব্বত অধিকারের পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে তিব্বতিরা ঘাঁটি করেছিলেন। তার মধ্যে এই জায়গাটিও পড়ে। পাহাড়ঘেরা শহরটির বুকেই রয়েছে একাধিক বৌদ্ধ মঠ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি গ্রামের মতোই এ পথেও চোখে পড়ে রঙিন পতাকা।
ছত্তীসগঢ়ের শিমলাও বলেন অনেকে মৈনপাটকে। ছবি:সংগৃহীত।
ছত্তীসগঢ়ের সরগুজা জেলার শান্ত শৈলশহরটিকে রূপের জন্য অনেকে ‘ছত্তীসগঢ়ের শিমলা’ও বলেন। ৪৩ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রাঁচি হয়ে ছত্তীসগঢ় গেলে সড়কপথে দূরত্ব পড়বে প্রায় ৭০৮ কিলোমিটারের মতো।
কলকাতা থেকে কোলাঘাট, ডেবরা, খড়গপুর, বহরাগোড়া, ঘাটশিলা হয়ে রাঁচি। দূরত্ব ৪০৪ কিলোমিটারের মতো। জামশেদপুরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় টাটা-কান্দরা রোড ধরে গিয়ে চান্ডিল জলাধার ঘুরে আসতে পারেন। পাহাড় ঘেরা জলাধারটি আয়তনে বিশাল। জমজমাট জায়গা। স্পিডবোটে চাপলে বেশ ভাল লাগবে।
ঘুরে নিতে পারেন চান্ডিল জলাধার। ছবি:সংগৃহীত।
চান্ডিল ঘুরে গেলে রাঁচী শহর পৌঁছোতে বিকেল হয়ে যাবে। সন্ধ্যাটা বরং বিশ্রাম নিন। পরদিনটি রাখুন রাঁচী শহর ঘুরে দেখার জন্য। হুন্ড্রু, জোনহা, সীতা ফল্সগুলি মোটামুটি খুব বেশি দূরে নয়। একদিনে ঘোরা সম্ভব। তবে সিঁড়ি ওঠা-নামার ধাক্কায় কাহিল হতে পারেন। না হলে পত্রাতু ভ্যালি ঘুরে নিতে পারেন অথবা দশম ফল্স।
দশম জলপ্রপাত। —নিজস্ব চিত্র।
তৃতীয় দিনে চলুন মৈনপাট। রাঁচী থেকে সিসই, লোদম, সীতাপুর, বমলয়া হয়ে খানিকটা এগোলেই বাঁ দিকের পথ চলে গিয়েছে মৈনপাট। ৪৩ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গেলে দূরত্ব পড়বে ৩০৪ কিলোমিটারের মতো। মৈনপাটের রাস্তায় উঠলেই পথ পাহাড়ি, যা যাত্রাপথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে।
মৈনপাটে রয়েছে বৌদ্ধমঠ। ছবি:সংগৃহীত।
মৈনপাট এককথায় ছবির মতো সুন্দর। ঝর্না, অরণ্য, বৌদ্ধমঠ— সমস্ত কিছুর সমাহার এক জনপদে। বর্ষায় মৈনপাট সবুজ। তবে অক্টোবরেও আবহাওয়া থাকবে মনোরম। মৈনপাট পৌঁছোতে বিকাল বা সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে। তাই সাইটসিয়িং শুরু করুন পরের দিন। জায়গাগুলি কাছাকাছি, ফলে ঘোরাঘুরির জন্য বিশেষ বেগ পেতে হবে না।
মৈনপাটের অন্যতম আকর্ষণ ‘উল্টাপানি’। নামেই রয়েছে বিশেষত্ব। ভিসারপানি গ্রামের ভিতরে ছোট্ট একটা জলের ধারা। তবে জল উপর থেকে নীচে নয়, প্রবাহিত হয় উল্টো দিকে। সেই জলপথে কাগজের নৌকো ভাসিয়ে দিলে স্পষ্ট হবে গতিবিধি। এখান থেকেই ঘুরে নেওয়া যায় পরপটিয়া সানসেট পয়েন্ট। সিঁড়ি ভেঙে বেশ কিছুটা হেঁটে পৌঁছোনো যায় এখানে। পাহাড়ের গা বয়ে আপন মনে বয়ে চলেছে ঝর্নার জলস্রোত। ঘুরে নিতে পারেন জলজলি পয়েন্ট। এখানে এক অদ্ভূত ভূমিরূপের সাক্ষী থাকা যায়। এই জায়গাটিতে লাফালে বুঝতে পারবেন, কী হচ্ছে? এই জায়গাকে বলা হয় ‘বাউন্সিং গ্রাউন্ড’। ঘুরে নিতে পারেন মছালি পয়েন্ট বা ফিশ পয়েন্ট।
দেখে নিন টাইগার পয়েন্ট জলপ্রপাত।
এ শহর জুড়ে রয়েছে তিব্বতি ছোঁয়া। বাজার থেকে খাবার, সবেতেই সেই স্বাদ মিলবে। এখান থেকেই ঘুরে নিতে পারেন ধাকপো শেপদুলিং মঠ। সূর্যাস্ত দেখার জন্যেও নির্দিষ্ট প্রান্তর রয়েছে। তবে বর্ষায় কালো মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়লেও, সবুজের মোহময় রূপ আপনাকে আবিষ্ট করে রাখবে।
অবশ্যই দেখে নেবেন মৈনপাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যোগীমারা গুহা। উপভোগ করতে পারেন টাইগার পয়েন্ট জলপ্রপাত। টাইগার পয়েন্টের নামের পিছনে রয়েছে বাঘের গল্প। কোনও এক সময় সেখানে নাকি বাঘের দেখা মিলত। জল খেতে আসত তারা।
ঘোরাঘুরির জন্য সেই দিনটি এবং পরের দিন সকালটি বরাদ্দ রাখুন। তারপর মধ্যাহ্নভোজ সেরে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিন। ফেরার সময় রাঁচীর বদলে জামশেদপুরেও রাত্রিবাস করতে পারেন।
কোথায় থাকবেন?
মৈনপাটে থাকার জন্য একাধিক রিসর্ট রয়েছে। সেখানেই থাকার পাশাপাশি খাবারেরও সুবন্দোবস্ত আছে।
কী ভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে ১২, ১৬, ১৮, ৪৯, ৪৩ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রাঁচী। সেখান থেকে ৪৩ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে বমলয়া ছাড়িয়ে সামান্য এগোলেই মৈনপাটের রাস্তা।
