নিজস্ব প্রতিবেদক · ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২:২২ অপরাহ্ন
শারদীয় দুর্গাপুজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় বৃহত্তম উৎসব। হিন্দু ধর্মমতে দুর্গাপূজা শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, বাঙালি সনাতনীদের আবেগ, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়েরও এক অনন্য প্রকাশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জমিদারবাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থেকে এ উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে দুর্গাপূজা আজ শিল্পকলা, সামাজিক বন্ধন ও সম্মিলিত আনন্দের অন্যতম প্রতীক। এ বছর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশকারী মহাশক্তি। মহিষাসুরকে হত্যা করে তিনি শুভ শক্তির বিজয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে বাঙালির কল্পনায় দুর্গার পরিচয় আরও আবেগঘন। তিনি উমা, হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা, যিনি প্রতিবছর কয়েক দিনের জন্য সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন বলে ধারণা বাঙালি সনাতনীদের।
তাই দেবীর এই আগমন ও বিদায়ের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির পারিবারিক জীবনের অনুভূতি, স্নেহ, পুনর্মিলন ও বিচ্ছেদের বেদনা। এ জন্য বাঙালি সনাতনীদের কাছে দুর্গাপূজা কেবল উপাসনাই নয় বরং; প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ারও একটি সুযোগ বা উৎসব।
বাংলায় জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার প্রসারে বিত্তশালী জমিদার ও রাজপরিবারগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজা কংসনারায়ণের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হয়। পরবর্তী সময়ে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজা অভিজাত আয়োজনের অন্যতম উদাহরণ হয়ে ওঠে। এসব পূজায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সংগীত, ভোজ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হতো।
একসময় দুর্গাপূজার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনগুলো মূলত বিত্তশালী পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের সঙ্গে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার সেই চিত্র বদলে দেয়। একাধিক ব্যক্তি ও পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগে পূজার আয়োজন শুরু হলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে। চাঁদা সংগ্রহ, স্বেচ্ছাসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে পুরো এলাকার মানুষের উৎসব।
দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। মৃৎশিল্পীদের দক্ষ হাতে মাটি থেকে গড়ে ওঠে দেবী দুর্গার প্রতিমা। শিল্পী, স্থপতি ও আলোকসজ্জাবিদদের সৃজনশীলতায় মণ্ডপগুলো পায় স্বতন্ত্র রূপ। ঢাকের বাদ্য, নতুন পোশাক, আড্ডা, খাবার আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ উৎসবকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
এই সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউনেসকোর মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’। ধর্মীয় আচার, শিল্পকলা, কারুশিল্প ও মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের সমন্বয় এই স্বীকৃতির অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় প্রকাশের উপলক্ষ। দীর্ঘ সময় ধরে সনাতনীদের অংশগ্রহণ, সামাজিক পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতনীদের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
