Authored By:
Published on
:
3 min read
এই সময়: বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পাঁচ মাস পরেও ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলো। একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকে হাতিয়ার করে এ নিয়ে দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)–কে নিশানা করেছেন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে কংগ্রেস ও বামেরাও। পাল্টা কমিশনের প্রশংসা করেছে বিজেপি।
ওই রিপোর্টে (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) দাবি করা হয়েছে ‘সার’-এর ‘অ্যাজুডিকেশন’ পর্বে আদালত নিযুক্ত জুডিশিয়াল অফিসাররা যে প্রায় ৩০ লক্ষের বেশি ভোটারের নথি স্ক্রুটিনি করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ছাড়পত্র দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ভোটারের নাম আবার বাদ দেওয়ার জন্য কমিশন আবেদন করেছে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ৩০ লক্ষের মধ্যে ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য কমিশনের আবেদন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এই সব পিটিশন কমিশন নিজেই করেছে, নাকি বিভিন্ন ব্যক্তি ওই সব নামে আপত্তি জানিয়ে আবেদন করেছেন, সেই আবেদনের সপক্ষে কী কী নথি জমা দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়েও সংশয় আছে।
অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে এই মুহূর্তে প্রায় ৩৮ লক্ষ আবেদনের শুনানি বিচারাধীন আছে এবং তার মধ্যে একটা বড় অংশ কমিশন নিজেই করেছে — এই তথ্য কয়েক মাস আগে ‘এই সময়’ প্রথম তুলে ধরেছিল। সুপ্রিম কোর্টে বাংলার ‘সার’ প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই মামলা বিচারাধীন আছে। সেখানেও কমিশন জানিয়েছে, জুডিশিয়াল অফিসারদের বাদ দেওয়া প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২২ লক্ষের বেশি মানুষ ফের নিজেদের নাম তোলার জন্য ট্রাইব্যুনালে গিয়েছেন। জুডিশিয়াল প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম যুক্ত হয়েছিল, তাঁদের একাংশের নাম বাদ দেওয়ার জন্য বাকি আবেদন করা হয়েছে। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ এখনও দেয়নি।
তবে এ দিন ওই সংবাদমাধ্যমের সামনে আসা প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে ২২২টি বিধানসভায় ছড়িয়ে রয়েছেন এই ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজারের বেশি ভোটার, যাঁদের নাম কমিশন বাদ দিতে চায়। এর মধ্যে এমন বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে জুডিশিয়াল অফিসারদের পরীক্ষায় পাশ করা ভোটারদের ৮০ শতাংশের বৈধতা নিয়ে ফের কমিশন ট্রাইব্যুনালে চ্যালেঞ্জ করেছে। এই ট্রেন্ডে সর্বনিম্ন হলো ২০ শতাংশ। যে তিনটি জেলায় সবচেয়ে বেশি নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে সেগুলি হলো মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর।
রাজ্যে ‘সার’ শুরু হওয়ার পরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি অথবা ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম না–থাকার কারণে ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম ‘অ্যাজুডিকেশন’ ক্যাটিগরিতে ঢুকে যায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পরবর্তী সময়ে জুডিশিয়াল অফিসাররা এই ক্যাটিগরিতে ঢুকে যাওয়া ভোটারদের নথি পরীক্ষা করেন। এই প্রক্রিয়ায় ৩০ লক্ষের বেশি ভোটার বৈধ বলে জুডিশিয়াল অফিসাররা চিহ্নিত করেন।
মহুয়া এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘মনোজ আগরওয়াল যখন রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের সিইও ছিলেন, তখন ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ভোটারকে বৈধ বলেছিলেন জুডিশিয়াল অফিসাররা। এখন সেই সিইও অফিস এঁদের বাদ দিতে উদ্যত হয়েছে। কে এটা করছে? কেন এটা করা হচ্ছে?’
মহুয়ার এই পোস্ট শেয়ার করেছেন সমাজকর্মী তিস্তা শেতলবাদ। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ নির্দিষ্ট ভাবে এই প্রতিবেদনের উল্লেখ না করে এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘ভোট চুরি হলো প্রমাণিত ফ্যাক্ট। নির্বাচন কমিশন কখনও বেআইনি ভাবে ফর্ম–৬ এ বদল করেছে, বিপুল সংখ্যায় ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ফর্ম–৭ ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার প্রক্রিয়ার সমস্ত আইনি রক্ষাকবচকে বাইপাস করার জন্য ইসিআইনেট-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার উপরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে নির্বাচন কমিশন।’
মহুয়া বা জয়রামের বক্তব্য নিয়ে বৃহস্পতিবার কমিশন কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। মন্তব্য করেননি রাজ্যের তৎকালীন সিইও তথা বর্তমান মুখ্যসচিব মনোজও। তবে এর আগে তাঁকে নিয়ে মহুয়ার দু’টি পোস্ট নিয়ে তিনি আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন এবং আদালত ওই পোস্টের উপরে অন্তর্বতী স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
‘সার’ প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীপক্ষের অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বঙ্গ বিজেপি। রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের সাফ কথা, ‘পশ্চিমবঙ্গের এ বারের বিধানসভা নির্বাচন দেশের সামনে নিঃসন্দেহে একটি উদাহরণ। হিংসাপ্রবণ একটি রাজ্যে এতগুলি পর্বে শান্তিতে নির্বাচন হয়েছে। ফল বেরিয়েছে, নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এটা আমরাও কল্পনা করতে পারিনি। নির্বাচন কমিশন এটা করেছে। নির্বাচন কমিশনের কাজের প্রশংসা করতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, ‘নির্বাচন কমিশন কি নিজের প্রক্রিয়ার উপরে আস্থা রাখতে পারছে না? জুডিশিয়াল অফিসারদের উপরে অনাস্থা প্রকাশ করছে? নাকি বিজেপিকে খুশি করতে চাইছে? এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলবে।’
ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে অথবা ত্রুটিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি হয়েছে সেই বিষয়ে আবেদন করার জন্য রাজ্যের মোট ২০টি অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল তৈরি করা হয়েছিল। এখন ১৯টি ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার গতি অতি মন্থর বলে রাজনৈতিক দলগুলির পর্যবেক্ষণ। কমিশন নিজেই আদালতে জানিয়েছে, যে গতিতে ট্রাইব্যুনালে শুনানি চলছে, তাতে শুনানি শেষ হতে ১২ বছর লেগে যাবে। এখন এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলার শুনানির দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের।
