চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) চলমান সংকট দ্রুত নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়েছে। অসুস্থ উপাচার্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত থাকায় সংকটের সমাধান হয়নি।
মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের দাবি ও অভিযোগ শোনেন এবং উপাচার্যের শারীরিক অবস্থা ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। আলোচনার পর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিতে সম্মত হন।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, উপাচার্য আর ক্যাম্পাসে ফিরবেন না—এমন শর্তে তাঁকে যেতে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
আলোচনায় জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমে তাঁদের দাবিগুলো যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা তাঁরা শুনেছেন ও দেখেছেন। শিক্ষার্থীরা পরিপক্বভাবে তাঁদের দাবি তুলে ধরেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উপাচার্যের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, একজন বয়স্ক ও সম্মানিত ব্যক্তির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে চট্টগ্রামের একটি ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য তাঁরা এসেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
চুয়েটের সংকট নিরসনে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কোনো সংকট মাসের পর মাস চলতে পারে না। সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দ্রুত সংকটের সমাধান হবে বলে তাঁরা প্রত্যাশা করছেন।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি পাওয়ার পর থেকেই সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগাযোগের পাশাপাশি সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গেও সমন্বয় করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো সরকারকে জানানো হবে। উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণ সরকারের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, কে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা সরকারের সিদ্ধান্ত। প্রশাসনের নিজস্ব পর্যায়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থী। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাঁর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও আলোচনার পর বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়েছে। আগে তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে, পরবর্তী বিষয়গুলো সরকারকে জানানো হবে।
আলোচনার সময় শিক্ষার্থীরা চুয়েটের একটি বাসে হামলার অভিযোগও তোলেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ তদন্ত করে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। এ সময় ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকার পর উপাচার্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। মঙ্গলবার তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. টিপলু কান্তি দে। পরীক্ষায় তাঁর রক্তচাপ ১৫০/১০০ পাওয়া যায়। এ ছাড়া তিনি বুকে ও শরীরের বাঁ পাশে তীব্র ব্যথার কথা জানান। চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা ক্যাম্পাসে যান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করেন। পরে উপাচার্যসহ অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে পরদিন থেকে শিক্ষার্থীরা কমপ্লিট শাটডাউন এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। সোমবার নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে গেলে শিক্ষার্থীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। মঙ্গলবার প্রশাসনের মধ্যস্থতায় তিনি মুক্ত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকটের সমাধান হয়নি।
