এম,শাহজাহান, শেরপুর জেলা প্রতিনিধিঃ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগে বালুমহাল ইজারা প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতেও বন্ধ হয়নি পাহাড়, নদী, ঝরনা ও খাল-বিল থেকে বালু-পাথর লুটপাট। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু-পাথর উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়ি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব। সংশ্লিষ্ট দুটি বালুমহাল ইজারা বন্ধ থাকায় প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি টাকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন চললেও তা বন্ধে বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না লুটপাট। ফলে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় মহারশি, সোমেশ্বরী ও কালঘোষা—এই তিনটি নদী রয়েছে। এর মধ্যে মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর দুটি বালুমহাল জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছর নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হতো। বালুমহাল দুটি থেকে সরকার বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব পেত বলে জানা গেছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালেও বালুমহাল দুটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বালুমহালের ইজারাদারদের মামলা ও
মারধরের ভয় দেখিয়ে তাঁদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি বালুমহাল দুটি দখলে নিয়ে ইজারার শর্ত ও প্রচলিত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পাহাড়, নদী, ঝরনা ও খাল-বিল থেকে নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলন শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে, নদীর তলদেশ ও তীরের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে এবং ঝরনা ও ছড়ার প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারী যানবাহনে এসব বালু-পাথর পরিবহনের কারণে পাহাড়ি এলাকার সড়ক ও জনপথও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। গারো পাহাড়ের শুধু পাহাড়, নদী ও ঝরনার সমষ্টি নয়; এটি নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী, পাখি, উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পাহাড়ের বনভূমি, ঝরনা ও নদী পারস্পরিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে এসব প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনা, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণের সুযোগও সংকুচিত হবে। এদিকে বালুমহাল দুটি ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা বিবেচনা করে সরকারিভাবে নতুন করে ইজারা প্রদান স্থগিত রাখা হয়। তবে ইজারা বন্ধ থাকলেও অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা মূল্যের বালু-পাথর উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে অবৈধ উত্তোলনকারীরা লাভবান হলেও সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ক্ষতির মুখে পড়ছে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। হুমকিতে পরেছে পরিবেশের ভারসাম্য। প্রথম দিকে পাহাড় কেটে পাথর বালু লুটপাট প্রতিরোধে বন বিভাগ ভুমিকা পালন করে আসলেও তারা প্রতিরোধে হিমসিম খাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে চলতি বছরের ৩ জুন রাতে বালু ভর্তি ৪ মাহিন্দ্র গাড়ি আটক করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বালুদস্যুরা বন কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ ও বন প্রহরী জিয়াউল হককে পিটিয়ে আহত করে। এঘটনার পর থেকে বালু লুটপাট বন্ধে বনবিভাগ কোন ভুমিকা পালন করছে না। উপজেলা প্রশাসনও নিরব ভূমিকা পালন করে আসছে। এ বিষয়ে উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো, আল আমীনের সাথে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বালু পাথর লুটপাট সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন আমি কি পাথর বালু নিয়ে বসে থাকবো উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) অনিন্দা রানী ভৌমিক সাথে কথা হলে তিনি বলেন ইউনিয়ন সহকারী ভুমি কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বালুমহাল ইজারা বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য সফল করতে হলে শুধু ইজারা স্থগিত রাখলেই চলবে না, অবৈধ উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি নদী, ঝরনা ও বনাঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে টেকসই সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এলাকাবাসীর দাবি, গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সম্পদ রক্ষা, রাজস্ব ক্ষতি প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাহাড়ি প্রকৃতি সংরক্ষণে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে বালুমহাল ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তখনই অর্থবহ হবে, যখন গারো পাহাড়ের নদী, ঝরনা ও পাহাড় থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি অপুরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে শেরপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ গারো পাহাড়।
The post ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ের ইজারাবন্ধ থাকলেও থামেনি বালু-পাথর লুটপাট সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব appeared first on sokalerkhobor24.com.
