ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় মায়ের সঙ্গে থাকে শিশুটি। কয়েক সপ্তাহ আগে তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময়ও মায়ের একটাই কথা ছিল—মেয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার বিচার তিনি চান। কিন্তু বিচার চাওয়ার পথটি শুধু আদালতে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মামলার পর থেকে পরিবারটিকে সামাজিক চাপ, সাক্ষীর অনীহা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ঢাকায় শিশু যৌন নির্যাতনের বিচারের অন্তরালের গল্প, দ্বিতীয় পর্বে উঠে এসেছে সেই ধাপ ও বাস্তবতার কথা যেসব ধাপে আটকে যায় বিচার।
এই মামলায় শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মেয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন মা। কিন্তু প্রতিবেশীরা আদালতে সাক্ষী হতে চান না। তারা ওই এলাকার ভাড়াটিয়া। মামলায় জড়ালে নিজেদের জীবনেও সমস্যা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা তাদের। এর মধ্যে পরিবারটিকে একাধিকবার আপসের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। মায়ের ভাষ্য, মেয়ের বিচার চাইতে গিয়ে এখন তাকে সংসারের দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

এই পরিবারের অভিজ্ঞতা শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচার বিলম্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। আদালতে মামলা আসার পর শুধু বিচারকের সামনে শুনানি হলেই বিচার এগোয় না। সাক্ষী হাজির করা, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য নেওয়া, চিকিৎসকের বক্তব্য গ্রহণ, মেডিকেল ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া—প্রতিটি ধাপের সঙ্গে পরের ধাপটি যুক্ত। এক জায়গায় অপেক্ষা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলায়।
বিচার বিলম্বের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে ভুক্তভোগীর জীবনে। শিশু অবস্থায় মামলা করা একজন ভুক্তভোগী কয়েক বছর পর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যেতে পারেন। এর মধ্যে তার পড়াশোনা, বাসস্থান, পরিবার—সবকিছু বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে যাতায়াত করতে গিয়ে পরিবারে মানসিক ও আর্থিক চাপও তৈরি হয়।
মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বিচারাধীন ৫০টির বেশি মামলা
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৫০টির বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে নিজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা আসামি। ট্রাইব্যুনালটির বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আব্দুল মজিদের দেওয়া তথ্য এটি।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের মামলার সংখ্যা শিশু নির্যাতনের পুরো চিত্র নয়। তবে পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের ভেতরে শিশুর নিরাপত্তার যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এটি তার একটি দিক সামনে আনে। একই সঙ্গে বিচার দীর্ঘ হলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর চাপ কীভাবে বাড়ে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল মজিদ জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি ভয়াবহ। শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা তার পরিবার, বিশেষ করে বাবা। সেই বাবার বিরুদ্ধেই যখন নিজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে, তখন এটি শুধু একটি মামলার বিষয় থাকে না; পরিবারের ভেতরে শিশুর নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। বিচার দীর্ঘ হলে ভুক্তভোগী শিশুর পাশাপাশি তার পরিবারের ওপরও মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।

প্রতিবেশী জানেন, কিন্তু সাক্ষী হতে চান না
আইনজীবীরা বলছেন, শিশু নির্যাতনের মামলায় সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায় না। অনেক সময় প্রতিবেশী বা ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে ওঠেন। কিন্তু সাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত সব সময় সহজ নয়।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর ওই পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রতিবেশীদের অনীহা রয়েছে। তারা ভাড়াটিয়া। মামলা নিয়ে আদালতে যেতে হলে নিজেদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সমস্যা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা তাদের।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, একজন মানুষ কেন সাক্ষী হতে চাইছেন না, তাকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে কি না, আদালতে আসার কারণে তার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে কি না কিংবা মামলায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তার নিরাপত্তাহীনতা আছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, শিশু আইন, ২০১৩-তে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, গোপনীয়তা ও সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়ে একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে শিশুর সাক্ষ্য পর্দার আড়ালে, ভিডিওর মাধ্যমে বা ক্যামেরা ট্রায়ালের মতো পদ্ধতিতে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আইনে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা আর বাস্তবে তা নিশ্চিত করতে পারা এক বিষয় নয়।
‘সাক্ষী হাজির হননি’, কিন্তু কেন?
আদালতের একটি তারিখের শেষে নথিতে লেখা থাকতে পারে, ‘সাক্ষী হাজির হননি’। এরপর নতুন তারিখ পড়ে। কিন্তু ওই একটি বাক্যের আড়ালে কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়—সাক্ষীকে ঠিকমতো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, ঠিকানা সঠিক ছিল কি না, নোটিশ তার হাতে পৌঁছেছিল কি না, তিনি অসুস্থ ছিলেন কি না কিংবা কাজ ফেলে আদালতে আসার সামর্থ্য ছিল কি না।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণ এক নয়। কারও ঠিকানা বদলাতে পারে, কেউ নোটিশ নাও পেতে পারেন, আবার কেউ আর্থিক বা সামাজিক সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই শুধু সাক্ষী আসেননি বলে দায় শেষ না করে তাকে হাজির করার জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও দেখা দরকার।
বিজ্ঞাপন
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাসুম বিল্লাহ বলেন, মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে, তাদের সাক্ষ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর সম্পর্ক নেই এমন সাক্ষী তালিকায় বেশি থাকলে সাক্ষ্যগ্রহণের সময়ও বাড়তে পারে। তাই তদন্তের পর্যায়েই সাক্ষী নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্ত কর্মকর্তা বদলি, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়া কিংবা সাক্ষী হাজির না হওয়া—প্রতিটি কারণ আলাদাভাবে মামলার সময় বাড়ায়। একই ঘটনা বারবার ঘটলে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও যোগ হয়ে যেতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা বদলি, মামলা থেকে যায়
শিশু নির্যাতনের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, কার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, কী আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কোন ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে—এসব বিষয়ে আদালতে তাকে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার পর কর্মকর্তার বদলি হলে তাকে আবার আদালতে হাজির করতে হয়। তিনি অন্য জেলা বা ইউনিটে চলে গেলে নোটিশ দিতে হয়। নির্ধারিত দিনে উপস্থিত না হলে আবার নতুন তারিখ পড়ে।
বিজ্ঞাপন
আইনজীবী তৌফিক হাসান বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়া কিংবা সাক্ষী হাজির না হওয়া—প্রতিটি কারণ আলাদাভাবে মামলার সময় বাড়ায়। একই ঘটনা বারবার ঘটলে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও যোগ হয়ে যেতে পারে।
প্রতিটি মামলায় সাক্ষী অনুপস্থিতির সংখ্যা, তদন্ত কর্মকর্তা বা চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন পেতে কত সময় লাগছে—এসব আলাদাভাবে নজরে রাখা হলে বিলম্বের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সহজ হবে।
তদন্ত শেষ, তবু প্রমাণের অপেক্ষা
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়লেই সব প্রমাণ আদালতের হাতে চলে আসে না। শিশু নির্যাতনের মামলায় চিকিৎসা পরীক্ষা, মেডিকেল প্রতিবেদন, আলামত এবং প্রয়োজনে ফরেনসিক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে ঘটনা সম্পর্কে জানেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন এমন ব্যক্তির বক্তব্য দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। একই ধারায় অভিযোগ পাওয়ার পর ভুক্তভোগীর প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, চিকিৎসক আদালতে এলেন না, পরের তারিখ পড়ল। ফরেনসিক প্রতিবেদন এল না, আবার অপেক্ষা। তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হলেন, তাকে হাজির করার জন্য নতুন উদ্যোগ প্রয়োজন হলো। এভাবে প্রতিটি ধাপের বিলম্ব মামলার সময় বাড়ায়।
ভুক্তভোগীর বয়স বাড়ে, মামলা একই জায়গায় থাকে
বিচার বিলম্বের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে ভুক্তভোগীর জীবনে। শিশু অবস্থায় মামলা করা একজন ভুক্তভোগী কয়েক বছর পর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যেতে পারেন। এর মধ্যে তার পড়াশোনা, বাসস্থান, পরিবার—সবকিছু বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে যাতায়াত করতে গিয়ে পরিবারে মানসিক ও আর্থিক চাপও তৈরি হয়।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল মজিদ বলেন, দীর্ঘদিন মামলা চললে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বা বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার প্রয়োজন হয়। বিচার বিলম্বের এই অদৃশ্য মূল্য মামলার নথিতে লেখা থাকে না।
আইনে দ্রুত বিচার, বাস্তবে কতটা?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারায় বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলার কথা বলা হয়েছে। একই ধারায় মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু এই সময়সীমার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে আদালতের বাইরের কাজের ওপর। সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সময়মতো না এলে বিচারপ্রক্রিয়াও থেমে যায়।
আব্দুল মজিদ বলেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হলে আদালতের পাশাপাশি সাক্ষী, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা দরকার।
তাহলে বিলম্বের দায় কার?
শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচার বিলম্বের জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা কঠিন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তের ঘাটতি, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি কিংবা ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা—প্রতিটি ধাপেই মামলার সময় বাড়াতে পারে।
আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, প্রতিটি মামলায় সাক্ষী অনুপস্থিতির সংখ্যা, তদন্ত কর্মকর্তা বা চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন পেতে কত সময় লাগছে—এসব আলাদাভাবে নজরে রাখা হলে বিলম্বের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সহজ হবে।
আব্দুল মজিদ বলেন, শিশু নির্যাতনের মামলার জট কমানোর বিষয়টি শুধু কতটি মামলা নিষ্পত্তি হলো, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মামলায় কোথায় কতটা সময় গেল এবং সেই বিলম্বের কারণ কী—তার হিসাব ও নিয়মিত পর্যালোচনাই বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
এমডিএএ/এসএইচএস/এমএফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
