কালবেলা · আন্তর্জাতিক
ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা দিতে মসজিদের মাইক ব্যবহারের উদ্যোগ
১২/১০/২০২৬

ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে মসজিদের মাইক ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আজান দেওয়ার মাইক ভূমিকম্পের সতর্কসংকেত দিতে কাজে লাগানো যায় কি না, তা যাচাই করা হবে।
জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ প্রতিরোধ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ইনোউ হিরোশির নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়া সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। জাপানের মতো ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।
ইনোউ বলেন, ইন্দোনেশিয়ার প্রায় প্রতিটি জনপদেই মসজিদ রয়েছে। ফলে আগে থেকে স্থাপিত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা মসজিদের মাইক ব্যবহার করে সহজেই বহু মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
প্রায় দুই দশক আগে সুমাত্রায় ভয়াবহ ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণার সময় তার মাথায় এই ধারণা আসে। ২০০৯ সালে পশ্চিম সুমাত্রায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত এক হাজার মানুষ নিহত হন। ইনোউর মতে, ভূমিকম্পের কম্পন শুরু হওয়ার আগে মানুষ সতর্কবার্তা পেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কয়েক লাখ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবার আজান দেওয়া হয়। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মসজিদের মাইক ভূমিকম্প শনাক্তকারী সেন্সর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের গবেষকেরা বলছেন, দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করতে দুটি বিষয় জরুরি। সতর্কসংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা এবং সেটি সচল রাখা। মোবাইল ফোননির্ভর সতর্কবার্তা ভূমিকম্পের সময় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু মসজিদের মাইক স্থানীয় মানুষের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ফলে এগুলো তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষক আন্দি একা সাকিয়া বলেন, প্রকল্পটি সফল হলে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হতে পারে। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য এখনো সতর্কবার্তা প্রচার শুরু হয়নি।
সাকিয়া জানান, ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের কোনো গ্রামে কম্পন পৌঁছানোর আগে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় পাওয়া যেতে পারে। তাই দ্রুত সতর্কসংকেত পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৮ নয়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলবে প্রকল্পটি। এতে স্কুলের মাইকের পাশাপাশি রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচারের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পে করণীয় নিয়েও গবেষণা
ইন্দোনেশিয়া ও জাপান দুই দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। এ কারণে দেশ দুটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। তবে ভূমিকম্পের সময় মানুষের আচরণ ও বেঁচে থাকার কৌশলে পার্থক্য রয়েছে।
জাপানে দুর্যোগবিষয়ক নির্দেশনায় সাধারণত নিচু হয়ে মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং কম্পন থামা পর্যন্ত সেখানেই থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার অনেক এলাকায় ভবন ইট-পাথরের তৈরি হলেও সেগুলো ভূমিকম্প সহনশীল নয়। ফলে এসব ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি বেশি। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
গবেষকেরা বলছেন, সব দেশের ভবন নির্মাণের ধরন এক নয়। তাই আন্তর্জাতিক নির্দেশনা সব পরিস্থিতিতে সমান কার্যকর নাও হতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে, তা নির্ধারণে তারা বিভিন্ন পরীক্ষা ও অনুকরণমূলক মহড়া চালাচ্ছেন।
মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশেও একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। উজবেকিস্তানে চলতি বছর ২৭২টি মসজিদে সতর্কসংকেত দেওয়ার যন্ত্র বসানোর পরীক্ষামূলক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও তুষারধসের বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করতে এসব মাইক ব্যবহার করা হবে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলেছে, স্থানীয় মানুষের কাছে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ও আস্থার প্রতিষ্ঠান। তাই এসব স্থাপনার মাইক ব্যবহার করে দ্রুত দুর্যোগের সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মূল প্রতিবেদনে যান ↗