আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত বছরের প্রথম সংস্করণের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ বছরও টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউটাউনের (TINT) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের উদ্যোগে সফলভাবে আয়োজিত অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম (ISICVA 2026)। কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী গবেষণাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ এবংও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি, গবেষণার নতুন সম্ভাবনা এবং বাস্তবক্ষেত্রে তার প্রয়োগ নিয়ে মত বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে এই সম্মেলন।
১২ অক্টোবর ‘VisionSphere 2026’-এর মাধ্যমে এই আয়োজনের সূচনা হয়। দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি হাতেকলমে প্রযুক্তিগত কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। কর্মশালার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ইবিজি ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ই. বালাগুরুস্বামীর বক্তব্য। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তিগত শিক্ষা, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবংও গবেষণার গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে আসে।
১৩ অক্টোবর এই আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউটাউনের অধ্যক্ষ তথা সম্মেলনের জেনারেল চেয়ার অধ্যাপক অয়ন চক্রবর্তী, সিএসই বিভাগের প্রধান তথা জেনারেল চেয়ার অধ্যাপক স্বাগত পল, ডেপুটি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সোমা চট্টোপাধ্যায়, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের বিশিষ্ট আধিকারিক অধ্যাপক অরিন্দম রায় ও শিক্ষাবিদরা ও দেশ-বিদেশের আমন্ত্রিত অতিথিরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অধ্যাপক ই. বালাগুরুস্বামী তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তি ও শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা, গবেষণার উৎকর্ষ এবংও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সম্মেলনের প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদদের বক্তৃতা। সার্বিয়ার সিঙ্গিডুনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিলান টুবা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়ার অধ্যাপক টিমোথি আদেলিই তাঁদের বক্তব্যে কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এছাড়াও, আইআইটি খড়গপুরের অধ্যাপক রজত শুভ্র চক্রবর্তী কম্পিউটার ভিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির গবেষণামূলক সম্ভাবনা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল বক্তৃতা প্রদান করেন।
সম্মেলনে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি তার নৈতিক, সামাজিক এবংও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয় দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা। প্রথম প্যানেল আলোচনার বিষয় ছিল ‘Privacy-Preserving Computer Vision’। আলোচনায় অংশ নেন ভিজিল্যান্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স রিসার্চ সেন্টার (VECC)-এর ড. তাপস সামন্ত, সম্রাট চৌধুরী এবং চিকিৎসক ড. অনিরুদ্ধ সরকার। কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তিতে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত চিত্রের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপদ ব্যবহার এবংও দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনার বিষয় ছিল ‘Human–AI Co-Creation: Redefining Creativity Through Computer Vision’। এই আলোচনায় অংশ নেন পাবলিকেশনের সুকল্প চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক শুভজিৎ দাস এবং বিশিষ্ট বাংলা ঔপন্যাসিক সায়ন্তন ঠাকুর। অধ্যাপক নীলাঞ্জন দে আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সৃজনশীলতার পরিবর্তিত ধারণা, মানব ও এআই-এর যৌথ সৃষ্টির সম্ভাবনা, মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট, মৌলিকতা, সাহিত্য ও সংবাদমাধ্যমে এআই-এর ব্যবহার, চৌর্যবৃত্তি এবংও ভুয়ো তথ্যের বিস্তার নিয়ে হওয়া আলোচনা বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবংও দায়িত্বশীল এআই-এর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এই আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গবেষণাপত্র উপস্থাপনা পর্ব। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অধিবেশনে দেশ-বিদেশের গবেষক ও শিক্ষাবিদরা তাঁদের গবেষণার ফলাফল, উদ্ভাবনী পদ্ধতি এবংও বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য ধারণা উপস্থাপন করেন। কম্পিউটার ভিশনের উদ্ভাবন, বুদ্ধিদীপ্ত ভিশন সিস্টেম, কম্পিউটার ভিশনের বিভিন্ন প্রয়োগ এবং স্মার্ট ভিশন অ্যাপ্লিকেশন— এই চারটি প্রধান গবেষণাক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে সম্মেলনে আলোচনা ও জ্ঞান বিনিময় হয়।
এ বছরের সম্মেলনে গবেষকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গিয়েছে। মোট ৩৭৬টি গবেষণাপত্র জমা পড়েছে। ১৫টি দেশের গবেষকদের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক মাত্রা লাভ করেছে। কঠোর পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাত্র ৬৪টি গবেষণাপত্র নির্বাচিত হয়। গৃহীত ও উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলি Springer-এর ‘Lecture Notes in Networks and Systems (LNNS)’ সিরিজে প্রকাশের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। যা Scopus সূচিভুক্ত। এর ফলে নির্বাচিত গবেষকরা আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিসরে নিজেদের কাজ তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
গত বছরের প্রথম সংস্করণের সাফল্যের ভিত্তিতে ISICVA 2026-এর এই আয়োজন টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউ টাউনের সিএসই বিভাগের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে। কম্পিউটার ভিশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবংও শিল্পক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, নতুন ধারণার বিকাশ এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসারে এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বর্ষেও এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সফল আয়োজনের মাধ্যমে TINT-এর CSE বিভাগ গবেষণামুখী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রসারে নিজেদের ধারাবাহিক উদ্যোগের প্রচেষ্টার পরিচয় দিয়েছে।
