ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, অবসর সময়ে আব্বু বসে বসে পেপার পড়ে। কিন্তু আব্বু যখন থেকে স্মার্টফোন ব্যবহার করা শুরু করেছে, তখন থেকে সেই পুরোনো অভ্যাসটা বদলে গেছে। এখন তার অবসর যাপনের একমাত্র সঙ্গী ইন্টারনেট।
দিনরাত ফেসবুকে ঘুরে ঘুরে নানারকম খবর পড়ে, ‘ডিম আর কলা একসঙ্গে খেলে মৃত্যু অবধারিত’ কিংবা ‘যে পাঁচ ভুলের কারণে মানুষের আয়ু কমে যায়’। তবে সেটা শুধু পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হরেকরকম টোটকা চিকিৎসার ভিডিও দেখে আমাকে আর আম্মুকে মাঝে মধ্যে জ্ঞানও দেয়। আম্মুও আব্বুর কথায় প্রভাবিত হয়ে সেসব মেনে চলার চেষ্টা করে।
কয়েকদিন আগে দুপুরে আমি বসে বসে টিভি দেখছি। হঠাৎ আব্বু এসে আমার পাশে বসল। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে কৌতূহলী সুরে বলল, ইন্টারনেটে এআই না কী যেন একটা বেরিয়েছে? মোতালেব ভাই বলল, ওই জিনিসটা নাকি দুনিয়ার সব প্রশ্নের উত্তর জানে।
আমি টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বললাম, ওটা হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তুমি যা জানতে চাইবে, ও ইন্টারনেট থেকে সার্চ করে, তারপর নিজের বুদ্ধি দিয়ে একটা উত্তর লিখে দেবে।
আব্বুর চোখ চকচক করে উঠল, তাই নাকি? দে তো, আমার ফোনে জিনিসটা একটু বের করে দে। দেখি কেমন বুদ্ধি।
আমি প্রথমে একটু এড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আব্বুর কাছে হার মেনে শেষমেশ চ্যাটজিপিটি ডাউনলোড করে বুঝিয়ে দিলাম কীভাবে লিখে প্রশ্ন করতে হয়। বাংলা টাইপ করা কঠিন। তাই কীভাবে ভয়েসে কথা বলা যায়, সেটাও শিখিয়ে দিলাম। এরপর থেকেই শুরু হলো আব্বুর এআই-নির্ভর জীবন।
বাজার থেকে কী আনলে স্বাস্থ্যের উপকার হবে, ছাদের টবে কত বেলা কতটুকু পানি দিতে হবে, এমনকি রাতের বেলা মশা তাড়ানোর উপায় কী–সবকিছুতেই আব্বুর একমাত্র ভরসা চ্যাটজিপিটি। ওদিকে, চ্যাটজিপিটিও তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি মিষ্টি শব্দচয়নে আব্বুর সঙ্গে তাল মেলাতে থাকে। সে একটা চমৎকার খাবারের লিস্টও করে দিয়েছে– সপ্তাহে দুদিন ছোট মাছ, দুদিন বড় মাছ, একদিন ডাল-আলুভর্তা, একদিন ডিম আর শুক্রবারে মাংস। আমরা এখন এভাবেই খাই।
শুক্রবার সকাল। চ্যাটজিপিটি বলল, গত তিনটি শুক্রবার আপনারা মাংস খেয়েছেন। তাই, রুচি পরিবর্তনের জন্য আজকে একটা মাছ কিনে আনুন। আব্বুও বাজার থেকে বেশ বড়সড় একটা ইলিশ মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরল। আম্মুও বেশ খুশি হয়ে বঁটি নিয়ে বসল। কিন্তু প্রথম কোপটা দিতেই আম্মুর মুখটা কালো হয়ে গেল। মাছের ভেতরটা একেবারে নরম, পচে গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল পচা মাছের গন্ধ।
আম্মু তো রেগে বাঘ। রান্নাঘর থেকে এদিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই তোমার বাজারের ছিরি? ৩০ বছর সংসার করেও ভালো কিছু কিনে আনতে পারো না? এতগুলো টাকা একদম পানিতে গেল।’
আব্বু একটু ঘাবড়ে গেল। তবে কিছু না বলে দ্রুত নিজের ফোনটা বের করে চ্যাটজিপিটি খুলে বলল, ‘বাজারের মাছওয়ালা ভুলভাল বুঝিয়ে আমাকে একটা পচা ইলিশ দিয়ে দিয়েছে। ওটা কাটতে গিয়ে আমার স্ত্রী খুব রেগে গেছে। এখন তাকে শান্ত করার উপায় কী?’
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ক্রিনে সুন্দর একটা উত্তর চলে এল। আমি উঁকি দিয়ে একটু পড়লাম। তারপর বললাম, ‘আব্বু, এসব এআইয়ের থিওরি না দেখে তুমি চুপচাপ গিয়ে অন্যকিছু রান্না করতে বলো।’
কিন্তু আব্বু আমার কথায় কান দিল না। ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলতে শুরু করল, ‘দেখো, আমি তোমার অনুভূতিটা বুঝতে পারছি। কিন্তু এই যে কথায় কথায় দোষারোপ করার সংস্কৃতি, এটা আমাদের দাম্পত্য জীবনের শান্তি নষ্ট করছে। এখানে আমার খুব একটা দোষ ছিল না। চলো, আমরা দুজনে বুদ্ধি করে একটা সুন্দর সমাধান বের করি।’
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আম্মু আগুনের মতো জ্বলে উঠল। ‘কী? দোষারোপের সংস্কৃতি? নিজে পচা মাছ কিনে এনে এখন আমাকে সংস্কৃতির বুলি শোনাচ্ছ?’
ততক্ষণে ঝগড়া রীতিমতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আম্মু বঁটি ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে আর আব্বুও তার থিওরি প্রমাণ করার জন্য তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। দুজনের গলার স্বর ক্রমেই বাড়তে লাগল। ধীরে ধীরে সেটা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাওয়ার উপক্রম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আমি দুজনের মাঝখানে গিয়ে থামানোর চেষ্টা করলাম।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। আম্মু তখন রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। হাতের কাছেই একটা লালরঙের প্লাস্টিকের মগ ছিল। আম্মু রাগের মাথায় মগটা তুলে জোরে আব্বুর দিকে ছুড়ে মারলেন। আব্বু চট করে মাথা নিচু করে ফেলায় মগটা পাশ কাটিয়ে সোজা এসে লাগল আমার ডান হাতে।
মগের একপাশে সামান্য ফাটা ছিল, জায়গাটা বেশ ধারাল। সেই ধারালো জায়গাটার ঘষা লেগে আমার কবজির কাছের চামড়াটা বেশ খানিকটা ছিলে গেল।
‘আহ!’ বলে আমি হাত চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়লাম। ছিলে যাওয়া জায়গাটা জ্বলে যাচ্ছে।
আমার চিৎকার শুনে এক নিমিষেই সব কোলাহল থেমে গেল। আম্মু ছুটে এসে আমার হাত চেপে ধরল, ‘ইশ, কেটে গেল নাকি? দেখি দেখি।’
আব্বুও তড়িঘড়ি করে এসে আমার পাশে বসল। দুজনের চোখেই অপরাধবোধ। মুহূর্তের মধ্যে পচা ইলিশ আর দোষারোপের সংস্কৃতি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।
আম্মু চিৎকার করে উঠল, ‘কী ব্যাপার? এখনো হা করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? তাড়াতাড়ি গিয়ে স্যাভলনের বোতলটা নিয়ে এসো।’
আব্বু দৌড়ে গিয়ে অ্যান্টিসেপটিক মলম এনে আমার হাতে লাগিয়ে দিল। পরিস্থিতি একেবারে শান্ত। কেউ আর কোনো কথা বলছে না, কিন্তু আমার হাতটা তখনো বেশ জ্বলছে।
আব্বু ধীর পায়ে হেঁটে আবার সোফায় গিয়ে বসল। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লিখল, ‘তোমার কথা শুনে তো কোনো কাজ হলোই না, উল্টো ঝগড়া বেড়ে আমার ছেলেটার হাতের চামড়া ছিলে গেল।’
আমি দূর থেকে দেখলাম, স্ক্রিনে এআই তার স্বভাবসুলভ বিনয়ী ভাষায় উত্তর দিচ্ছে, ‘আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত যে আমার দেওয়া পরামর্শটি আপনার স্ত্রীর রাগ প্রশমনে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। যেহেতু প্লাস্টিকের মগের আঘাতে আপনার ছেলের হাত ছিলে গেছে, আমি পরামর্শ দেব দ্রুত স্থানটি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করতে। আপনি কি চান আমি এই মুহূর্তে নিকটস্থ কোনো ডাক্তারের চেম্বারের ঠিকানা খুঁজে বের করি?’
