হাজারো ভক্তের উলুধ্বনি, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং ঢাক-ঢোলের বাদ্যধ্বনিতে সিলেটে সুরমা নদীতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট নগরীর ঐতিহাসিক চাঁদনীঘাটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমা নিরঞ্জন কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে টানা ছয় দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের শেষ দিনে বিজয়া দশমী উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে ভক্তরা চাঁদনীঘাটে জড়ো হন। পরে উলুধ্বনি ও বাদ্যযন্ত্রের তালে একে একে সুরমা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। দর্পণ বিসর্জন ও দেবী আরাধনাসহ দশমীর বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসব।
বুধবার বিকেল ৪টার দিকে সিলেট মহানগর ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে চাঁদনীঘাটে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরমধ্যে সিলেট জেলায় সর্বজনীন ৪৪৮টি ও পারিবারিক ২৬টিসহ মোট ৪৭৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বজনীন ১৪৭টি ও পারিবারিক ১৬টিসহ মোট ১৬৩টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন সংঘ ও সংগঠনের উদ্যোগে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এদিন সকালে ও দুপুরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর নিবেদনের মধ্য দিয়ে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা। পরে ধর্মীয় রীতি অনুসারে দর্পণ বিসর্জন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে, প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে চাঁদনীঘাট এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ। নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশের কয়েকটি বিশেষায়িত ইউনিটও নিয়োজিত ছিল। পুরো শারদীয় দুর্গোৎসবজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে।
প্রতি বছরের মতো এবারও সিলেটে প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হয়। ভক্তদের ধর্মীয় আবেগ, আনন্দ ও বিষাদের আবহে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় উৎসব।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন দেবী দুর্গা। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসবের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা। মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উৎসব বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়।
এদিকে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট নগরীর চাঁদনীঘাটে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার প্রতিমা নিরঞ্জন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
তিনি বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের সমাজে থেকে যাবে। অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের অবসানই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হচ্ছে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সম্মান করা এবং বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; আর উৎসবের আনন্দ সবার।
সিসিক প্রশাসক বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগরবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক সব উৎসব যেন নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দময় পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে মহানগরীর ৮৫টি পূজামণ্ডপের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা ও মণ্ডপভিত্তিক ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সড়ক মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও পূজামণ্ডপে আলোকসজ্জা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পূজামণ্ডপ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, মণ্ডপভিত্তিক জোন নির্ধারণ, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজা ও বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নাগরিক সেবার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশনের বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়। ফলে পূজা উদযাপন কমিটি কিংবা নগরবাসী কোনো নাগরিক সমস্যা বা জরুরি বিষয়ে দ্রুত যোগাযোগ করতে পেরেছেন।
তিনি আরও বলেন, বিসর্জনকে কেন্দ্র করে চাঁদনীঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উৎসবের আনন্দ সবার জন্য নিরাপদ রাখতে সবাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের প্রতি সবাইকে বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে।
কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতের ভিন্নতা থাকলেও ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্নে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি যেন কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সেটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। গুজব, অপপ্রচার, উসকানি বা বিভাজন সৃষ্টিকারী কোনো তথ্য যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সিলেট চাই, যেখানে একজন মুসলমান নিশ্চিন্তে ঈদ উদযাপন করবেন, একজন হিন্দু নিশ্চিন্তে দুর্গাপূজা করবেন, একজন বৌদ্ধ ও একজন খ্রিস্টানও নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন। এটাই বাংলাদেশের ঐতিহ্য, এটাই সিলেটের সম্প্রীতির ঐতিহ্য।
তিনি বলেন, বিসর্জনের পর নদীর তীর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমাদের সবার। সিলেটকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুব্রত দেব। যৌথভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন- সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার দাস এবং মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাস।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সিলেটে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার শ্রী অনিরুদ্ধ দাস, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সিলেটের ট্রাস্টি সুদীপ সেন বাপ্পু এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মলয় পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপীকা শ্যাম পুরকায়স্থ।
এছাড়া বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও মদন মোহন সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রজত ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা।
