কবেই তো ধরা পড়ে গেছে তার চাতুরী—জাতীয় উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণতন্ত্রকে গণভবন নামক প্রাসাদে বন্দি করার নাটক। অধুনা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন মডেলটি ইতোমধ্যেই গণঅভ্যুত্থান ও নির্বাচনি রায়ের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছেন এ দেশের জনগণ।
তার তোষামোদকারীরা অবশ্য প্রকাশ্যেই দাবি করতেন, বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য স্বৈরতন্ত্রই অধিক উপযোগী। সেজন্যই হয়তো মাফিয়াতন্ত্রবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের দুবছর পরও মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টির অপচেষ্টা দেখছি : তবে কি স্বৈরাচারী শাসনে আসলেই বেশি উন্নতি হয়?
বিজ্ঞাপন
যারা সমকালীন বিশ্ববাস্তবতা বিশ্লেষণ করেন, তারা পরিবর্তনের বার্তাও দিয়ে থাকেন; এই লেখক যেমন জুলুমশাহি শাসনের অবসানের অপেক্ষায় থাকা সময়কে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। সুতরাং স্বৈরতান্ত্রিক শাসন উচ্চ প্রবৃদ্ধি আনে—এমন কোনো যুক্তির বালাই নেই এই নিবন্ধে; বরং স্বৈরতন্ত্র উন্নয়নের জন্য আদৌ উপযুক্ত কি না—সেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
তবে আধুনিক গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একে অন্যের পরিপূরক, নাকি সাংঘর্ষিক—এ নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক করতেই পারেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা। তাই বলে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারীরা কি এ ধরনের সুশীল বিতর্কে অংশ নেওয়ার নৈতিক যোগ্যতা রাখেন? তারা গণতন্ত্রের জন্য বেমানান, কারণ ভিন্নমত দমন এবং জনগণের অধিকার হরণ করে তাদেরই ক্ষোভ থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেছেন; তারা উন্নয়নবিরোধীও, কারণ তারা ডাকাতের মতো জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করেছেন।
দেশ ও বিদেশে পালিয়ে থাকা এই পরাজিত শক্তি তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেছেন বা অবস্থান পরিবর্তন করেছেন—এমন কোনো খবর কারো কাছে নেই। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধহীন হলেও সেই ‘হাসিনা শাসন’ই তাদের পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকট এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির খবরে হাসিনা-সমর্থকরা মওকা পেয়েছেন নিজেদের পাপ আড়াল করার। কিছু সমালোচক ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চাপে হাসিনার পতন কেন অনিবার্য ছিল, সেই যৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন। ইনিয়ে-বিনিয়ে, গোপনে-প্রকাশ্যে তাদের প্রপাগান্ডা বলে দেয়, তারা কারা এবং আরো কী বলতে চান : হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সমার্থক ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের চেয়ে উত্তম।
তাই গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের গাত্রদাহের লক্ষণ সুস্পষ্ট। হাসিনা জামানার জবরদস্তিমূলক নীরবতার মধ্যেও যারা নিজেদের স্বস্তির জায়গা খুঁজে পেয়েছিলেন, সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণবন্ত রূপ তাদের কাছে অসহ্য বাস্তবতা। সংসদে বিরোধী দল—জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি—ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এখানে-সেখানে বিক্ষোভ করছে। অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার যা খুশি বলছেন, যেকোনো কিছুর সমালোচনা করছেন। ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিতে, এগুলো কেমন গণতন্ত্রের নমুনা!
তাদেরই একদল অতি উৎসাহী আশা করছেন, ক্ষমতাচ্যুত দল ও তার নেত্রীর এক অসম্ভব রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে। কীভাবে? নিশ্চয়ই জনসমর্থন নিয়ে নয়। কারণ, আওয়ামী মনস্তত্ত্ব যে গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না, তা জনগণের মুখোমুখি হওয়া বা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয় থেকেই প্রমাণিত।
অন্যদিকে, নিজেদের বয়ান ছাড়া গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে তারা আর কোনো অগ্রগতি দেখেন না। তাহলে দেখা যাক, ১৯৭৫ সালে হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল শাসনামলে প্রবৃদ্ধি কত ছিল—ঋণাত্মক (মাইনাস) ৪ শতাংশ। আর ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে তার রাজনৈতিক ভ্রাতা এইচ এম এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনামলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮-৪.০ শতাংশ—ওই দশক ছিল আরেক অন্ধকার যুগ।
১৯৯০-এর দশকে দারিদ্র্য এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করে। নির্বাচনি ব্যবস্থার নতুন যাত্রার সঙ্গে সেই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১.০ বেড়ে ৫.০ শতাংশে পৌঁছায় এবং পরবর্তী দশকে তা ৬.০ শতাংশ স্পর্শ করে।
হাসিনার ১৫ বছরের অগণতান্ত্রিক শাসনামলে ৭.০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে যে উল্লম্ফনের দাবি করেন তার সমর্থকরা, তাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সমর্থন জোগায় এবং তা মহিমান্বিত করে কিছু বিদেশি পক্ষও। বাংলাদেশের উন্নয়নের সব কৃতিত্ব হাসিনা সরকারকে দেওয়ার সময় ওই পক্ষগুলো ভুলে যায় এর আগের ১৬ বছরের নির্বাচনি ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত অর্থনৈতিক গতিশীলতার কথা। হাসিনা শাসনের আসল ‘কৃতিত্ব’ হলো, এ দেশের মানুষ দেখেছে ক্ষমতাশালীরা ইচ্ছামতো টাকা কামাতে পারে কীভাবে—বাড়িয়ে দেখানো উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজারে কারসাজি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের উচ্চমূল্য দিয়ে জনগণকে জিম্মি করা, প্রতিটি বাজার ও পাবলিক প্লেসে ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঁদাবাজি, নানা উপায়ে সরকারি তহবিল তছরুপ এবং আরো কত কী!
এটি ছিল সেই সময় (২০০৯-২০২৪), যখন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) ১০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে, যার মোট প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪৮ বিলিয়ন ডলার। তবে একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধির দুই-তৃতীয়াংশ বা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে বিদেশে চলে গেছে।
তখন যদি জনগণের কণ্ঠস্বর রোধ করা না থাকত, তবে কি এই প্রবৃদ্ধি আত্মসাৎ করা সম্ভব হতো? এটিই প্রমাণ করে, নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ উন্নয়নের যে অজুহাত দিয়েছিল, তা বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কতটা নিবেদিত ছিল।
এখন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সূচিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর, কিছু ছদ্মবেশী খেলোয়াড় প্রশ্ন তুলবেন, কেন ব্যবসা ও বিনিয়োগ এখনো গতি পাচ্ছে না এবং কেন ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আর ব্যাংক খাতই বা কেন অসহনীয় খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না।
হাসিনার প্রতি সহানুভূতিশীল সমালোচকরা শিগগির এসব সমস্যার জন্য নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে দায়ী করবেন। তারা এড়িয়ে যাবেন, বর্তমান সরকার কার কাছ থেকে এই অর্থনৈতিক সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কোন চ্যালেঞ্জগুলো নতুন করে যোগ হয়েছে—ইউটিলিটি বা সেবামূল্যের উচ্চ ব্যয়, ব্যাপক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি, সরকারের নিম্নমানের সেবা প্রদান, নাকি জনকল্যাণমূলক ব্যয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করা ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধের দায়?
অলিগার্কি বা গোষ্ঠীপ্রীতির পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনকে প্রত্যাখ্যান করার বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টার পর, অবশেষে ২০২৪ সালে জনগণ প্রমাণ করেছে, তারা তার উন্নয়ন মডেলকে কতটা ভালোবেসেছিল। ৫ আগস্ট ছিল অগণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণের দিন।
হাসিনা যে কায়দায় জনগণের প্রতিনিধিত্বকে খর্ব করে তার করপোরেট-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন, তাতে প্রবৃদ্ধির সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অধিকারকে স্বীকার করা হয়নি।
উন্নয়ন বলতে সুনির্দিষ্টভাবে জনগণের উন্নয়নকেই বোঝায়, যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের দাবি উত্থাপনের সুযোগ থাকে। বিশ্বব্যাপী মানব উন্নয়ন সূচকে উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগই নির্বাচনি ব্যবস্থা অনুসরণ করে। এমনকি সবচেয়ে খারাপ গণতান্ত্রিক সরকারকেও ব্যবসা বা বিশেষ করে মুনাফা বৃদ্ধির পক্ষে কোনো নিয়মকানুন জারি করার আগে জনগণের অধিকার ও কল্যাণের কথা ভাবতে হয়।
অগণতান্ত্রিক কোনো কথা বলা বা কাজ না করার জন্য হাসিনার কোনো গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ছিল না। তার তো জনগণের ভোটের প্রয়োজন ছিল না। এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি তার দলের এক সংসদ সদস্যকে জমি দখলের অভিযোগে পদত্যাগ করতে বলেছেন। তার সরকার জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত। সুতরাং জনগণের কথা শুনে উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা ছাড়াও জনজীবনে প্রভাব ফেলে এমন যেকোনো ভুল সংশোধন বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে তার লজ্জিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশকে গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত করার জন্য নয়, বরং গণতন্ত্রের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হয়—এমনটাই লিখেছেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তার ‘মার্কেটস, মোরালস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে। তার উক্তি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সেই বিখ্যাত উক্তির আদলে : ‘একটি দেশকে গণতন্ত্রের যোগ্য বলে গণ্য হতে হয় না; বরং গণতন্ত্রের মাধ্যমেই তাকে যোগ্য হয়ে উঠতে হয়।’
সেদিন ফুরিয়ে গেছে, যখন কিছু অসৎ গোষ্ঠী বাংলাদেশে গণতন্ত্র নাকি উন্নয়ন প্রয়োজন—তা নিয়ে বিতর্ক তুলত। আজ সমগ্র জাতির একটাই উত্তর : উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশিরা প্রগতির সেই অন্ধকার যুগে আর ফিরে যেতে চান না।
লেখক : সাংবাদিক
khawaza@gmail.com
