আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের চলমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুক্রবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘এরভেবো’ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান। তার মতে, এ পরীক্ষার মাধ্যমে বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এরভেবো টিকাটি ইবোলার অপেক্ষাকৃত পরিচিত জাইরে প্রজাতির বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। তবে বর্তমানে কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ভাইরাসের বিরুদ্ধে এটি কোনো সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সেটিই যাচাই করা হবে।
টেড্রোস বলেন, ‘এই পরীক্ষার মাধ্যমে বুন্ডিবুগিও ভাইরাসের জন্য তৈরি টিকার সম্ভাব্য প্রার্থীগুলো কার্যকর কি না, তা বুঝতে সাহায্য করবে।’
তিনি আরও বলেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং প্রয়োজনীয় উত্তর খুঁজে পেতে কঙ্গোর নেতৃত্বে পরিচালিত এ উদ্যোগকে সহায়তা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
গত মে মাসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে দেশটির ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। এটিকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর থেকে দেশটিতে ৯ হাজার ৭০০-এর বেশি আক্রান্ত এবং ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টিকারী জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এটি সংস্থাটির সর্বোচ্চ সতর্কতার ঠিক নিচের স্তরের জরুরি ঘোষণা।
বর্তমান প্রাদুর্ভাব আফ্রিকার পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের চারটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে এটি আফ্রিকা মহাদেশে এ পর্যন্ত দেখা ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত।
‘তুমাইনি’ নামে পরিচিত এ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একাধিক টিকার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির সক্ষমতা পরীক্ষা করা যায়।
পরীক্ষায় ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এ পদ্ধতিতে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের টিকা দেওয়া হয়, যাতে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।
এরভেবো টিকার পাশাপাশি বুন্ডিবুগিও প্রজাতির জন্য বিশেষভাবে তৈরি আরও দুটি সম্ভাব্য টিকা এ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ দুটি টিকা বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের ছোট পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে।
একটি টিকা তৈরি করছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এতে সিএইচএডিওএক্স১ নামের অ্যাডেনোভাইরাস-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য টিকাটি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে এমআরএনএ প্রযুক্তি।
মহামারি প্রস্তুতি বিষয়ক জোট (সিইপিআই) জানিয়েছে, দুটি টিকাই তাদের অর্থায়ন পেয়েছে এবং শিগগিরই পরীক্ষায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে গর্ভবতী নারী এবং ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সাধারণত অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এসব জনগোষ্ঠীকে বাদ রাখা হয়। ফলে তাদের ক্ষেত্রে টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক চিকওয়ে ইহেকওয়াজু বলেন, ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে অংশগ্রহণকারী টিকাগুলো সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করতেই এ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বুন্ডিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে। তবে পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার আগে কোনো টিকাকেই এ প্রজাতির ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর বলে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
