কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে এখন কয়েকটি নির্দেশনা লিখেই তৈরি করা যাচ্ছে নানা ধরনের ছবি। কখনো তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞাপনের জন্য পণ্যের নকশা, কখনো বইয়ের প্রচ্ছদ, কার্টুন, দেয়ালসজ্জার ছবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারচিত্র। এসব ছবি শুধু শখের কাজেই নয়, আয় করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
এআই দিয়ে ছবি তৈরি করতে পেশাদার চিত্রশিল্পী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভালো ফল পেতে প্রয়োজন সঠিক নির্দেশনা লেখার দক্ষতা, নকশা সম্পর্কে ধারণা, ছবির মান যাচাই এবং ক্রেতার চাহিদা বোঝার ক্ষমতা। শুধু ছবি তৈরি করলেই আয় নিশ্চিত হয় না; ছবিটি কার প্রয়োজন, কোথায় বিক্রি করা যাবে এবং কীভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যাবে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে আয় করা সম্ভব
১. প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপনের ছবি তৈরি
ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পণ্য ও সেবার প্রচারে ছবি ব্যবহার করে। এআই দিয়ে পণ্যের প্রচারচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ব্যানার, প্রচারপত্র ও বিজ্ঞাপনের নকশা তৈরি করে আয় করা যায়। বাংলাদেশের অনলাইন ব্যবসা, পোশাকের দোকান, রেস্তোরাঁ, প্রসাধনীর প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী ব্যবসার জন্য এ ধরনের কাজের সুযোগ খোঁজা যেতে পারে। তবে বাস্তব পণ্যের ছবি ব্যবহার করা হলে তার সঙ্গে তৈরি করা এআই-ছবির সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
২. গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ছবি তৈরি
অনলাইনে কাজের বাজারে বিভিন্ন গ্রাহক বইয়ের প্রচ্ছদ, চরিত্রের নকশা, ধারণাভিত্তিক ছবি, উপস্থাপনার চিত্র কিংবা প্রচারণার জন্য বিশেষ ছবি খোঁজেন। গ্রাহকের নির্দেশনা অনুযায়ী এআই দিয়ে ছবি তৈরি করে প্রয়োজনমতো সম্পাদনা ও চূড়ান্ত নকশা সরবরাহ করা যায়। এ ধরনের কাজের জন্য ফাইভার, আপওয়ার্কের মতো স্বাধীন পেশাজীবীদের কাজের বাজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কাজ পাওয়ার জন্য নমুনা নকশার সংগ্রহ, নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা এবং গ্রাহকের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ প্রয়োজন।
৩. ছবি বিক্রির ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া
কিছু ওয়েবসাইটে ছবি জমা দিয়ে অনুমোদনের পর সেগুলো ব্যবহারের লাইসেন্স বিক্রি করা যায়। ক্রেতা ছবি ব্যবহার করলে নির্মাতা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অর্থ পেতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে, অ্যাডোবি স্টক এআই দিয়ে তৈরি ছবি গ্রহণ করে। তবে ছবিতে এআই ব্যবহারের বিষয়টি নির্ধারিত নিয়মে জানাতে হয় এবং মান, স্বত্ব ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। অন্যদিকে, শাটারস্টক সাধারণ অবদানকারীদের কাছ থেকে এআই দিয়ে তৈরি ছবি গ্রহণ করে না। ফলে ছবি জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের নীতিমালা যাচাই করা জরুরি।
৪. ডিজিটাল পণ্য তৈরি করে বিক্রি
এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করে দেয়ালসজ্জার নকশা, ক্যালেন্ডার, আমন্ত্রণপত্র, শুভেচ্ছাকার্ড, শিশুদের রঙ করার বই কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল পণ্য তৈরি করা যায়। এসব পণ্য অনলাইন বিপণন ব্যবস্থা বা নিজস্ব বিক্রয়মাধ্যমে বিক্রি করা সম্ভব। তবে শুধু একই ধরনের ছবি তৈরি করে জমা দিলে বিক্রি নাও হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্রেতা গোষ্ঠী নির্বাচন, নকশার মান, পণ্যের বিবরণ, দাম এবং প্রচারণার ওপর বিক্রির সম্ভাবনা নির্ভর করে। বিক্রির মাধ্যমের নিয়ম অনুযায়ী এআই ব্যবহারের তথ্যও জানাতে হতে পারে।
৫. টি-শার্ট, মগ ও পোস্টারের নকশা
এআই দিয়ে তৈরি মৌলিক নকশা ব্যবহার করে টি-শার্ট, মগ, পোস্টার ও অন্যান্য পণ্যের নকশা তৈরি করা যায়। কিছু মুদ্রণ ও সরবরাহ সেবা ক্রেতার অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য তৈরি করে পাঠায়। এতে নিজে থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত করার প্রয়োজন কমতে পারে। তবে নকশায় অন্য প্রতিষ্ঠানের লোগো, অনুমতি ছাড়া ব্যবহৃত চরিত্র, বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি কিংবা স্বত্ব সংরক্ষিত উপাদান থাকলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিক্রয়মাধ্যমের নিয়মও আগে যাচাই করতে হবে।
শুরু করবেন যেভাবে
এআই দিয়ে ছবি তৈরির কাজ শুরু করতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথম ধাপ
একটি নির্দিষ্ট বিষয় বেছে নিন। বিজ্ঞাপনের ছবি, বইয়ের প্রচ্ছদ, শিশুদের চিত্র, খাবারের ছবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশার মতো একটি ক্ষেত্র দিয়ে শুরু করুন।
দ্বিতীয় ধাপ
ছবি তৈরির সরঞ্জাম শিখুন। নিজের প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী এআইভিত্তিক ছবি তৈরির সরঞ্জাম বেছে নিন। বিনা মূল্যের সুবিধা, দৈনিক ব্যবহারের সীমা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের শর্ত যাচাই করুন।
তৃতীয় ধাপ
নির্দেশনা লেখার দক্ষতা বাড়ান। ছবির বিষয়, পটভূমি, রং, আলোর ধরন, ছবির বিন্যাস ও কাঙ্ক্ষিত শৈলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে শিখুন। একই নির্দেশনায় তৈরি একাধিক ছবির মধ্যে সেরা ছবিটি বেছে নিন।
চতুর্থ ধাপ
ছবি সম্পাদনা করুন। ছবির ভুল, অস্বাভাবিক হাত-পা, বিকৃত লেখা কিংবা অসংগত উপাদান পরীক্ষা করুন। প্রয়োজন হলে এডিটিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে সংশোধন করুন।
পঞ্চম ধাপ
নমুনার সংগ্রহ তৈরি করুন। নিজের সেরা ১০ থেকে ১৫টি নকশা নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারেন। এতে সম্ভাব্য গ্রাহক কাজের মান ও দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
ষষ্ঠ ধাপ
ক্রেতার কাছে পৌঁছান। অনলাইন কাজের বাজারে কাজের প্রস্তাব দিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নমুনা প্রকাশ করুন কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। শুরুতে নির্দিষ্ট সেবা ও কাজের পরিধি স্পষ্ট করে মূল্য নির্ধারণ করুন।
আয় কত হতে পারে?
এআই দিয়ে ছবি তৈরি করে মাসে কত টাকা আয় হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেউ গ্রাহকের জন্য নকশা তৈরি করে পারিশ্রমিক পেতে পারেন, আবার কেউ ছবি বিক্রির ওয়েবসাইটে ছবি জমা দিয়েও দীর্ঘ সময় বিক্রি না-ও পেতে পারেন। আয়ের পরিমাণ নির্ভর করে কাজের মান, গ্রাহকের চাহিদা, প্রতিযোগিতা, বিক্রির মাধ্যম, প্রচারণা এবং সরঞ্জাম ব্যবহারের খরচের ওপর। তাই শুরুতেই বড় অঙ্কের আয়ের প্রত্যাশা না করে ছোট কাজ দিয়ে দক্ষতা ও বাজারের চাহিদা যাচাই করা ভালো।
কপিরাইট ও ব্যবহারের নিয়মে সতর্কতা
এআই দিয়ে তৈরি সব ছবিই যে সব জায়গায় বিক্রি করা যাবে, তা নয়। ছবি তৈরির সরঞ্জামের বাণিজ্যিক ব্যবহারের শর্ত এবং যে ওয়েবসাইটে ছবি বিক্রি করা হবে, তার নীতিমালা আলাদা হতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে এআই দিয়ে তৈরি কাজের স্বত্ব নিয়ে আইনি অবস্থানও এক রকম নয়। অন্যের ছবি বা নকশা অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা, বিখ্যাত ব্যক্তির পরিচিতি কাজে লাগানো কিংবা প্রতিষ্ঠানের লোগো অনুকরণ করে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যেসব ওয়েবসাইটে এআই ব্যবহারের ঘোষণা দিতে হয়, সেখানে সঠিক তথ্য দেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, এআই দিয়ে ছবি তৈরি করে আয় করার সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে শুধু ছবি তৈরির কৌশল জানলেই হবে না; প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সম্পাদনার দক্ষতা, ক্রেতার চাহিদা বোঝা এবং নিয়ম মেনে কাজ করার অভ্যাস।
ওয়েবসাইট: অ্যাডোবি স্টক, ফাইভার, আপওয়ার্ক, ক্যানভা
তথ্যসূত্র: সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর নীতিমালা ও নির্দেশিকা
