হলিউডের অ্যাকশন মুভি বা ভিডিও গেমে দুর্ধর্ষ সব কমান্ডোদের সঙ্গে লড়াই করতে দেখা যায় মিলিটারি কুকুরদের। নিশ্চয়ই এমন দৃশ্য আপনি মুভিতে দেখেছেন? ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে শত্রুর ডেরায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়া কিংবা বোমার গন্ধ শুঁকে বের করার কাজে কুকুরদের কোনো জুড়ি নেই।
কিন্তু এই কুকুরগুলোকে এখন আর স্বাভাবিক নিয়মে জন্ম নিতে হবে না। ফ্যাক্টরিতে গাড়ির মডেল আপগ্রেড করার মতো ল্যাবরেটরিতে জিন এডিটিং করে একেবারে পারফেক্ট এবং ভয়ংকর এক সুপারডগ বাহিনী তৈরি করা হচ্ছে। শুনতে কল্পবিজ্ঞান কল্পবিজ্ঞান মনে হতে পারে। কিন্তু ঘটনা সত্যি।
বাস্তবে ঠিক এমনটাই ঘটাতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ওয়ারহাউন্ড নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান। এটি একটি নতুন ডিফেন্স-বায়োটেকনোলজি স্টার্টআপ।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের বেন ল্যাম এবং অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের পামার লাকির মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়েছে এই সুপারডগ বানানোর বুদ্ধি।
এই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য অত্যাধুনিক জিন-এডিটিং প্রযুক্তি এবং ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর জন্য এমন সব কুকুর তৈরি করা, যেগুলো হবে সাধারণ কুকুরের চেয়ে আকারে অনেক বড়, ভয়ংকর শক্তিশালী এবং নিখুঁত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞানের বর্তমান ক্ষমতায় কি সত্যিই এমন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন মার্কা কুকুর তৈরি করা সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়ও, এর পেছনের ভয়ঙ্কর মূল্যটা কে চোকাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের বেন ল্যাম এবং অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের পামার লাকির মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়েছে এই সুপারডগ বানানোর বুদ্ধি।
কীভাবে ল্যাবরেটরিতে জন্ম নিচ্ছে এই ভয়ংকর কুকু
ওয়ারহাউন্ড কোম্পানিটি কিন্তু বসে নেই। বেন ল্যাম জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই বেলজিয়ান ম্যালিনয় এবং শেফার্ডের মতো বিশ্বের সবচেয়ে এলিট ও চৌকস মিলিটারি কুকুরের ডিএনএ সংগ্রহ করে তাদের বায়োব্যাংকে সংরক্ষণ করে ফেলেছেন। বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা হলো,
এই সেরা কুকুরগুলোর কোষ থেকে ক্লোন করে ভ্রূণ তৈরি করা হবে। আর সেই ভ্রূণ মায়ের পেটে বড় হওয়ার আগেই তার ভেতরের জিনগুলোকে কাঁটাছেঁড়া করে জন্ম দেওয়া হবে নতুন সুপারডগ। তারা আশা করছেন, ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই ল্যাবরেটরিতে তৈরি তাদের প্রথম কুকুরের ব্যাচ পৃথিবীর আলো দেখবে।
কিন্তু কেন এই জিন এডিটিং? কারণ, ওয়ারহাউন্ড চায় তাদের কুকুরগুলো হবে একেবারে ত্রুটিমুক্ত। সাধারণ কুকুরদের বয়স বাড়লে কোমরের হাড়ের ক্ষয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো বা ক্যান্সারের মতো মারাত্মক সব রোগ হয়। এর কারণে ওদের সময়ের আগেই অবসরে পাঠাতে হয়। বেন ল্যামের মতে, তাদের তৈরি কোনো কুকুরের শরীরে এমন কোনো জিনের অস্তিত্বই থাকবে না, যা ভবিষ্যতে কোনো রোগের সৃষ্টি করতে পারে।
পরবর্তীতে তারা এই কুকুরগুলোর আয়ু বাড়ানো এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আরও নিখুঁত পারফরম্যান্স নিশ্চিত করার জন্য জিনে আরও পরিবর্তন আনবেন।
সাধারণ কুকুরদের বয়স বাড়লে কোমরের হাড়ের ক্ষয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো বা ক্যান্সারের মতো মারাত্মক সব রোগ হয়। এর কারণে ওদের সময়ের আগেই অবসরে পাঠাতে হয়।
কোটি ডলারের চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার সত্য
শুনতে চমৎকার মনে হলেও মুদ্রার উল্টো পিঠের গল্পটা কিন্তু বেশ শিউরে ওঠার মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসক ও বায়োএথিসিস্ট লিসা মোসেস এই পুরো প্রক্রিয়ার অন্ধকার দিকটি সামনে এনেছেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, কুকুরের ক্লোন করাটা কোনো জাদুকরী বা নিখুঁত বিজ্ঞান নয়; এটি আক্ষরিক অর্থেই একটি মারাত্মক অদক্ষ এবং নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া।
ল্যাবরেটরিতে একটি সফল ও সুস্থ ক্লোন ছানার জন্ম দিতে গিয়ে অসংখ্য কুকুরকে চরম যন্ত্রণাদায়ক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যে গর্ভধারিণী মা কুকুরগুলোর পেটে এই ল্যাবরেটরির ভ্রূণগুলো বড় করা হয়, তাদের জীবনও ভয়ানক ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া, জিন নিয়ে খেলা করাটা মোটেও সুইচ অন-অফ করার মতো সহজ নয়।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বায়োটেকনোলজি সংস্থা রিভাইভ অ্যান্ড রিস্টোরের প্রধান বিজ্ঞানী বেন নোভাক জানান, ‘কুকুরের একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব পরিবর্তনের জন্য হয়তো শত শত বা হাজার হাজার জিনের মিউটেশন নিয়ে কাজ করতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটতে পারে মারাত্মক সব শারীরিক বিপর্যয়!’
যে গর্ভধারিণী মা কুকুরগুলোর পেটে এই ল্যাবরেটরির ভ্রূণগুলো বড় করা হয়, তাদের জীবনও ভয়ানক ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া, জিন নিয়ে খেলা করাটা মোটেও সুইচ অন-অফ করার মতো সহজ নয়।
আগেও কুকুরের জিনে পরিবর্তন আনার ইতিহাস আছে। ওয়ারহাউন্ডের অংশীদার কলোসাল বায়োসায়েন্সেস গত বছর একটি সাধারণ ধূসর নেকড়েকে ক্লোন ও এডিট করে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ভয়ংকর ডায়ার উলফের মতো প্রাণী তৈরি করেছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়ারহাউন্ডের এই প্রজেক্টটি রীতিমতো সোনার ডিম পাড়া হাঁস! মাত্র লঞ্চ করেই তারা বাজার থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছে। কারণ, আমেরিকার মতো দেশে মিলিটারি কন্ট্রাক্ট পাওয়া মানেই টাকার খনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরুৎপাদনশীল চিকিৎসা এবং বায়োটেক গবেষণা ইনস্টিটিউট অ্যাস্টেলাস ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবার্ট ল্যানজা চরম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘বিজ্ঞানের চোখে এটি সম্ভব হলেও অসংখ্য ব্যর্থতা এবং শারীরিক ত্রুটি ছাড়া এই প্রজেক্ট সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব।’ মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু কুকুরকে যখন ল্যাবরেটরির গিনিপিগ বানিয়ে কোটি টাকার ব্যবসায় নামা হয়, তখন বিজ্ঞানের নৈতিকতার সুতোটি যে ছিঁড়তে আর বেশি বাকি নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান
